দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, মামলা-হামলা, গ্রেপ্তার ও রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় থাকা বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীদের একটি অংশ বর্তমানে দলীয় মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ তুলছেন। তাদের দাবি, রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর যারা দীর্ঘদিন মাঠে ছিলেন না, তাদের অনেকেই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছেন। এতে তৃণমূলের পুরোনো ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের মধ্যে বাড়ছে হতাশা ও ক্ষোভ।
এই ক্ষোভকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মীর দাবি, দলটির বিভিন্ন পর্যায়ে অবহেলিত ও পদবঞ্চিত নেতাদের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীদের যোগাযোগ বাড়ছে। তবে এ ধরনের যোগাযোগ বা কথিত গোপন বৈঠকের বিষয়ে দলীয়ভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি আপাতত স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের আলোচনা ও তৃণমূলের অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে নারায়ণগঞ্জে জামায়াত ও এনসিপির সাংগঠনিক তৎপরতা অবশ্য দৃশ্যমান হয়েছে। গত ৫ সেপ্টেম্বর মদনপুরে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের পথসভায় জামায়াত ও এনসিপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা অংশ নেন। সেখানে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং জামায়াতের কেন্দ্রীয় ও নারায়ণগঞ্জের নেতাদের উপস্থিতি ছিল।
এর আগে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির পক্ষ থেকে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণার ঘটনাও রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ায়। আগস্টে এ নিয়ে বিএনপির বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি হয়। এরপর ৫ সেপ্টেম্বর পাটওয়ারী নারায়ণগঞ্জে এসে ১১ দলীয় লংমার্চের পথসভায় অংশ নেন।
অন্যদিকে, এনসিপি নারায়ণগঞ্জে নিজেদের সাংগঠনিক কাঠামোও গড়ে তুলেছে। চলতি বছরের মার্চে দলটি জেলা ও মহানগরের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করে। জেলা এনসিপির আহ্বায়ক করা হয় যুবাইর আহমেদ সরদারকে এবং মহানগরের আহ্বায়ক হন মো. শওকত আলী। মহানগর কমিটিতে সদস্য সচিব হিসেবে রয়েছেন আশিকুর রহমান অভি।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জ জেলা এনসিপি নির্বাচন পরিচালনা কমিটিও গঠন করেছে। ফলে নতুন দল হিসেবে সংগঠন বিস্তারের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের রাজনীতিতে এনসিপির সক্রিয়তা বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিএনপির তৃণমূলের একাধিক নেতাকর্মীর অভিযোগ, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে যারা মামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন, তাদের অনেকেই এখন দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় গুরুত্ব পাচ্ছেন না। বরং অপেক্ষাকৃত নতুন কিংবা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক সময়ে সক্রিয় হওয়া ব্যক্তিদের একটি অংশ দ্রুত সামনে চলে আসছেন।
নারায়ণগঞ্জ সদর এলাকার এক বিএনপি কর্মীর ভাষ্য, “বিগত ১৭ বছর আমরা মামলা-মোকদ্দমা মাথায় নিয়ে রাজপথে ছিলাম। অনেকেই ব্যবসা-বাণিজ্য হারিয়েছেন, পরিবার থেকে দূরে থেকেছেন। এখন দলের সুদিন এসেছে। কিন্তু সেই সময়ের কর্মীদের অনেকেই মূল্যায়ন পাচ্ছেন না এটাই সবচেয়ে বড় কষ্ট।”
সিদ্ধিরগঞ্জের কয়েকজন সাবেক যুবদল ও ছাত্রদল নেতারও একই ধরনের অভিযোগ। তাদের দাবি, আন্দোলনের সময় মাঠে থাকা কর্মীদের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে এমন ব্যক্তিরা গুরুত্ব পাচ্ছেন, যাদের অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে তৃণমূলে প্রশ্ন রয়েছে।
তাদের একজন বলেন, “তৃণমূলের নেতাকর্মীদের শুধু মিছিল-মিটিংয়ে লোক জড়ো করার সময় মনে করা হয়। কিন্তু নেতৃত্ব কিংবা সাংগঠনিক দায়িত্ব বণ্টনের সময় তাদের মতামত কতটা নেওয়া হচ্ছে, সেটাই প্রশ্ন।”
ফতুল্লার এক প্রবীণ বিএনপি নেতার দাবি, এই অসন্তোষ দীর্ঘস্থায়ী হলে এর রাজনৈতিক সুযোগ নিতে পারে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো। তার ভাষায়, “তৃণমূলের ক্ষোভকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। যারা বছরের পর বছর মাঠে ছিল, তাদের পাশে দাঁড়াতে না পারলে অন্য রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পাবে।”
নারায়ণগঞ্জ বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। জেলা বিএনপির ৩৩ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটিতে মামুন মাহমুদকে আহ্বায়ক এবং মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়াকে প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে; অন্য দুই যুগ্ম আহ্বায়ক হলেন মাসুকুল ইসলাম ও শরীফ আহমেদ।
মহানগর বিএনপিতেও আহ্বায়ক হিসেবে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান এবং সদস্য সচিব হিসেবে আবু আল ইউসুফ খান টিপুর নেতৃত্বে সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে। ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মহানগর বিএনপির আয়োজনে বড় ধরনের র্যালি অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিভিন্ন ওয়ার্ডের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।
জেলা বিএনপিও ৫ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শহরে র্যালি করেছে। এতে জেলা ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণ ছিল।
তবে প্রকাশ্য কর্মসূচিতে বড় উপস্থিতি থাকলেও তৃণমূলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মী সাংগঠনিকভাবে সমানভাবে সক্রিয় বা মূল্যায়িত হচ্ছেন কি না সেটি নিয়ে দলের ভেতরেই আলোচনা রয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ ভবিষ্যতের বিভিন্ন নির্বাচনী প্রক্রিয়া সামনে থাকায় নারায়ণগঞ্জে সব রাজনৈতিক দলই তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্ত করতে চাইবে। এনসিপি ইতোমধ্যে জেলা ও মহানগর পর্যায়ে কাঠামো তৈরি করেছে, আর জামায়াতও নিয়মিত রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয় রয়েছে। একই সময়ে ১১ দলীয় ঐক্যের কর্মসূচিতেও দুই দলের নেতাদের একসঙ্গে মাঠে দেখা গেছে।
এ অবস্থায় বিএনপির তৃণমূলে থাকা পদবঞ্চিত বা অবহেলিত নেতাকর্মীদের ক্ষোভ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে তা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে বিএনপির তৃণমূলের অভিযোগের বিপরীতে জেলা ও মহানগর বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। দলীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে যদি বলা হয় যে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তৃণমূলকে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে এবং যোগ্যতা ও সাংগঠনিক ভূমিকার ভিত্তিতেই নেতৃত্ব নির্ধারণ করা হচ্ছে, তাহলে অভিযোগগুলোর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আরও পরিষ্কার হবে।
সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে এখন বড় প্রশ্ন—দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের কতটা মূল্যায়ন করা হবে এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর তৎপরতার মধ্যে বিএনপি কীভাবে নিজেদের তৃণমূলের ঐক্য ধরে রাখবে। তৃণমূলের ক্ষোভ দ্রুত প্রশমিত না হলে ভবিষ্যতে এর প্রভাব দলীয় সাংগঠনিক শক্তি ও নির্বাচনী রাজনীতিতে পড়তে পারে বলেই মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক মহল।

