নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া হকার্স মার্কেট এলাকায় মাদকসংক্রান্ত বিরোধের জেরে শুভ চন্দ্র দাস ওরফে মো. বিল্লাল হত্যাকাণ্ডের তদন্তে একের পর এক তথ্য সামনে আসছে। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য ও স্থানীয়ভাবে আলোচিত অভিযোগ অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে সন্দেহ করা আরও কয়েকজন এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের মধ্যে দুই ভাই বাহার ও রাহাতকে ঘিরে তদন্তে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
তদন্তে থাকা তথ্য অনুযায়ী, রাহাতের একটি মোটরসাইকেল বাংলাদেশ হোসিয়ারি অ্যাসোসিয়েশনের মিলনায়তনের সামনে থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি গ্রেপ্তার সুমন ওরফে ‘মাইগ্যা সুমন’কে উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পর বাহার তাকে ফোন করে ‘ওস্তাদ কাম সাকসেস’ বলেছিলেন। তবে বাহার নিজে একটি ভিডিও বার্তায় এ অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, শুভর সঙ্গে তার এমন কোনো সম্পর্ক ছিল না এবং তাকে উদ্দেশ্য করেই বিভিন্ন কথা বলা হচ্ছে। ফলে বাহার ও রাহাতের ভূমিকা তদন্তে কীভাবে উঠে আসে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
গত ৫ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত সোয়া ১টার দিকে চাষাঢ়া হকার্স মার্কেটের পেছনে দুর্গামন্দিরসংলগ্ন সড়ক থেকে গুলিবিদ্ধ ও ছুরিকাহত অবস্থায় শুভ চন্দ্র দাসের মরদেহ উদ্ধার করে সদর মডেল থানা পুলিশ। এ ঘটনায় নিহতের বাবা বাদী হয়ে সদর মডেল থানায় মামলা করেন। মামলাটি তদন্তে নামে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সিয়াম আহমেদ সিজান, মো. সুমন ওরফে ‘মাইগ্যা সুমন’ এবং মো. সোহানকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তে পুলিশের ভাষ্য, ১০টি ইয়াবার বিনিময়ে শুভর সহযোগী সোহানকে ব্যবহার করে তাকে ঘটনাস্থলে ডেকে আনা হয়। পরে একদল ব্যক্তি তাকে গুলি ও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে।
গ্রেপ্তার সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ডে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে রামকৃষ্ণ মিশনের প্রধান ফটকের কাছের গাছের ঝোপ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল ও ম্যাগাজিন উদ্ধার করে ডিবি। পুলিশের তথ্যমতে, অস্ত্রটির ব্যারেলে ‘MADE IN USA 7.65 MM’ লেখা ছিল। তদন্তকারীরা বলছেন, উদ্ধার অস্ত্রটি হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছিল কি না, তা তদন্তের অংশ হিসেবে যাচাই করা হচ্ছে।
এর আগে নিহতের মরদেহ থেকে ইয়াবা ও গুলির খোসা উদ্ধারের তথ্যও পুলিশ জানিয়েছিল। মরদেহে গুলির পাশাপাশি একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। এসব আলামত হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত ছিল কি না এবং এতে কতজন সরাসরি অংশ নিয়েছিল—তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য ও বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের আগে আমলাপাড়ার একটি বাড়িতে ডিবির মাদকবিরোধী অভিযানকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত হতে পারে। ৩ সেপ্টেম্বরের ওই অভিযানে গাঁজা, দেশীয় অস্ত্র ও একটি মোটরসাইকেল উদ্ধারের কথা জানানো হয়। এরপর শুভকে ওই অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সন্দেহ করে একটি পক্ষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে—এমন তথ্য তদন্তে এসেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনিক ও সুমনকে কেন্দ্র করে হত্যার পরিকল্পনার অভিযোগ উঠে এসেছে। আরও কয়েকজনের নেতৃত্বে ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল এতে অংশ নেয় বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে বলে পুলিশ-সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে এসব তথ্য এখনো তদন্তের অংশ এবং আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয়।
গ্রেপ্তার তিন আসামির পর তদন্তের নজরে আসে অনিক, অহিদ, বাহার ও রাহাতের নাম। তাদের মধ্যে বাহার ও রাহাত এখনো গ্রেপ্তার না হওয়ায় তদন্তের পরবর্তী ধাপ তাদের ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। রাহাতের মোটরসাইকেল উদ্ধারের বিষয়টিও তদন্তে একটি আলামত হিসেবে এসেছে।
বিশেষ করে সুমনের কথিত ফোনালাপের বর্ণনা—‘ওস্তাদ কাম সাকসেস’—নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে বাহার প্রকাশ্য ভিডিও বার্তায় সুমনের বক্তব্যের বিরোধিতা করেছেন। ফলে এই বক্তব্যের সত্যতা, ফোন যোগাযোগের তথ্য এবং বাহার-রাহাতের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই হওয়াই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
হত্যাকাণ্ডের তদন্তের পাশাপাশি শুভর মরদেহের ধর্মীয় পরিচয় নিয়েও কয়েক দিন ধরে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। নিহতের বাবা দাবি করেন, শুভ হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছিলেন এবং হিন্দু রীতিতে সৎকার করতে হবে। অন্যদিকে মা, স্ত্রী ও ভাইয়ের দাবি ছিল, শুভ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ‘বিল্লাল’ নাম ধারণ করেছিলেন এবং তাকে ইসলামী রীতিতে দাফন করতে হবে। বিরোধের কারণে মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়।
এ নিয়ে হাইকোর্টে রিট হলে আদালত শুভ ওরফে বিল্লালের মরদেহ ইসলামী রীতিতে দাফনের নির্দেশ দেন এবং মরদেহ তার স্ত্রী জ্যোতির কাছে হস্তান্তরের নির্দেশনা দেন। মামলার নথিতে ২০০৩ সালের ২৬ জুন নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে করা একটি এফিডেভিটের উল্লেখ রয়েছে, যেখানে শুভসহ তার মা ও ভাইয়ের ইসলাম ধর্ম গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।
আদালতের নির্দেশ পাওয়ার পর ১৩ সেপ্টেম্বর রাতে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মাসদাইর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে পুলিশি পাহারায় জানাজা শেষে শুভ চন্দ্র দাস ওরফে মো. বিল্লালের দাফন সম্পন্ন হয়। এর মধ্য দিয়ে মরদেহ নিয়ে চলা দীর্ঘ আইনি ও পারিবারিক জটিলতার অবসান ঘটে।
শুভ হত্যার ঘটনায় তিনজন গ্রেপ্তার, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বলে সন্দেহ করা আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার এবং কয়েকজনের নাম তদন্তে আসার পরও পুরো ঘটনার চূড়ান্ত চিত্র এখনো প্রকাশ পায়নি। বিশেষ করে বাহার ও রাহাতের অবস্থান, রাহাতের মোটরসাইকেল ঘটনাস্থলসংলগ্ন স্থানে কীভাবে গেল, সুমনের বক্তব্যের সঙ্গে বাহারের অস্বীকৃতির কোনটি সত্য এবং হত্যার পরিকল্পনায় অনিক-অহিদসহ অন্যদের প্রকৃত ভূমিকা কী ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে তদন্ত ও আদালতের পরবর্তী কার্যক্রমে।
ডিবি জানিয়েছে, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তাই বাহার ও রাহাত গ্রেপ্তার হলে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও অন্যান্য আলামত যাচাইয়ের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, অর্থ বা মাদকের যোগসূত্র এবং ঘটনাস্থলে কারা সরাসরি উপস্থিত ছিল—এসব বিষয়ে আরও তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।

