মাঠটা হয়তো গ্রামের। কখনো স্কুলের খোলা প্রাঙ্গণ, কখনো উপজেলা সদরের ছোট্ট মাঠ। নেই আধুনিক সরঞ্জাম, নেই নিয়মিত প্রশিক্ষণের নিশ্চয়তা। তবু সেই মাঠেই দৌড়ায় কেউ, বল পায়ে ছুটে চলে কেউ, ব্যাট হাতে স্বপ্ন দেখে কেউ। তাদের চোখে শুধু একটি জার্সির স্বপ্ন নয় জাতীয় দলের হয়ে খেলা, আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের পতাকা তুলে ধরা, এমনকি একদিন অলিম্পিকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্নও আছে।
তৃণমূল থেকে উঠে আসা ৩০৬ জন প্রতিভাবান কিশোর-কিশোরীর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর প্রথম আসরে জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখা এই খেলোয়াড়দের আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিকেএসপিতে দুই মাসের নিবিড় প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রশিক্ষণ শেষে অসাধারণ প্রতিভা দেখানো খেলোয়াড়দের মধ্য থেকে যোগ্যদের সরকারি খরচে বিকেএসপিতে ভর্তি, পড়াশোনা ও খেলাধুলার ব্যয় বহনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
তৃণমূলের ক্রীড়া প্রতিভা খুঁজে বের করতে আয়োজিত ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর প্রথম আসরে ব্যাপক সাড়া পড়ে। দেশজুড়ে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৬২২ জন খেলোয়াড় এতে নিবন্ধন করেন। ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায় থেকে শুরু করে উপজেলা, জেলা, বিভাগ পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে সেরাদের বাছাই করা হয়।
সেই বিশাল প্রতিযোগিতা থেকে উঠে এসেছে ৩০৬ জন। এখন তাদের সামনে আরও বড় পরীক্ষা নিজেদের প্রতিভাকে আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়াবিদ হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ।
যাদের অনেকে হয়তো এতদিন পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, ভালো কোচ কিংবা প্রয়োজনীয় ক্রীড়া সরঞ্জামের অভাবে নিজেদের প্রতিভা মেলে ধরার সুযোগই পায়নি, তাদের জন্য বিকেএসপির এই প্রশিক্ষণ নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে।
সরকারের পরিকল্পনাটি শুধু দুই মাসের প্রশিক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশিক্ষণে যারা অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দেবে, তাদের মধ্য থেকে যোগ্যদের বিকেএসপিতে বিনা খরচে ভর্তি করার পাশাপাশি পড়াশোনা ও খেলাধুলার খরচও সরকার বহন করবে বলে জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক।
অর্থাৎ দরিদ্র কিংবা প্রত্যন্ত এলাকার কোনো পরিবারের সন্তান প্রতিভাবান হলেও অর্থের অভাবে যেন খেলাধুলা ছেড়ে দিতে না হয় দীর্ঘমেয়াদে সেই বাধা দূর করার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ।
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক এরই মধ্যে জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় শুধু অংশগ্রহণ করাই সরকারের লক্ষ্য নয়; বরং পদকের জন্য লড়াই করতে পারে এমন ক্রীড়াবিদ তৈরি করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এশিয়ান গেমস কিংবা অলিম্পিকের মতো বড় আসরে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অবস্থানে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই তৃণমূল থেকে প্রতিভা বাছাই ও প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ৩০৬ জনকে বিকেএসপিতে নিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণের উদ্যোগ।
তৃণমূল পর্যায়ে ক্রীড়া কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করতে দেশের ৫০৩টি উপজেলায় ক্রীড়া কর্মকর্তা নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ২০১টি উপজেলায় ক্রীড়া কর্মকর্তা নিয়োগের কার্যক্রম অনুমোদিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। পর্যায়ক্রমে সব উপজেলায় এই কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এর ফলে প্রত্যন্ত এলাকার খেলোয়াড়দের চিহ্নিত করা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং জাতীয় পর্যায়ের জন্য প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায়েই একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হতে পারে।
বর্তমান সময়ে কিশোর-কিশোরীদের একটি বড় অংশ যখন মোবাইল ফোন ও বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইসনির্ভর হয়ে পড়ছে, তখন তাদের মাঠমুখী করাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। খেলাধুলার মাধ্যমে কিশোরদের মাদক, অপরাধপ্রবণতা ও অতিরিক্ত ডিভাইস-আসক্তি থেকে দূরে রাখার বিষয়টিও সরকারের ক্রীড়া পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
শুধু প্রতিভাবান খেলোয়াড় তৈরি নয়, একটি সুস্থ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম গড়ে তুলতেও খেলাধুলাকে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে দেখছে সরকার।
শিশুদের ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত করতে ২০২৭ সালের শিক্ষাক্রমে চতুর্থ শ্রেণি থেকে ‘খেলাধুলা’ নামে পৃথক পাঠ্যপুস্তক যুক্ত করার উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী। এর সঙ্গে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কর্মসূচির সমন্বয় রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থাৎ মাঠ, স্কুল এবং প্রশিক্ষণ তিন জায়গাতেই খেলাধুলার চর্চা বাড়ানোর একটি সমন্বিত পরিকল্পনার দিকে এগোচ্ছে সরকার।
১৬ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলা মিনি স্টেডিয়ামের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এসব পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। অনুষ্ঠানে স্থানীয় সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম আজাদসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, খেলাধুলাকে শুধু বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তৃণমূলের প্রতিটি প্রতিভার কাছে সুযোগের আলো পৌঁছে দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
আড়াইহাজারের নতুন মিনি স্টেডিয়াম তাই শুধু একটি মাঠের উদ্বোধন নয়; বরং প্রত্যন্ত এলাকার কিশোর-কিশোরীদের জন্য একটি বার্তা প্রতিভা থাকলে সুযোগের দরজা এখন আরও দূরে নয়।
আজ যে কিশোরটি গ্রামের মাঠে খালি পায়ে দৌড়াচ্ছে, যে কিশোরীটি স্কুলের মাঠে একাই অনুশীলন করছে—তাদের মধ্য থেকেই হয়তো আগামী দিনের জাতীয় দলের খেলোয়াড় উঠে আসবে। আর ৩০৬ ‘নতুন কুঁড়ি’র সামনে এখন সেই পথটাই খুলে যাচ্ছে।

