নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া ৩১ নবাব সলিমুল্লাহ রোডে অবস্থিত বাংলাদেশ হোসিয়ারী এসোসিয়েশনের সম্পত্তি ‘হোসিয়ারী সমিতি ভবন’ দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ব্যবসায়ী সংগঠনের এই ভবনটি কার নিয়ন্ত্রণে, সেখানে কারা নিয়মিত যাতায়াত করেন এবং ভবনটি কী কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে এসব প্রশ্নের পাশাপাশি সম্প্রতি শুভ দাস হত্যা মামলায় হত্যায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল ওই ভবনের ভেতর থেকে উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে রহস্য তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ী সংগঠনটির নেতাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ভবনের একটি অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে রাজনৈতিক কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করছেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু। ভবনটি উদ্ধারের জন্য সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে স্মারকলিপি দেওয়া হলেও কার্যকর কোনো সমাধান হয়নি বলেও অভিযোগ তাদের।
তবে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে শুভ দাস হত্যাকাণ্ডের পর। গত ৮ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার আসামিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) বাংলাদেশ হোসিয়ারী এসোসিয়েশনের ভবনের ভেতর থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করে। একই অভিযানে চাষাঢ়া রামকৃষ্ণ মিশনের দেয়ালঘেঁষা গাছের ঝোপ থেকে একটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়।
হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল একটি ব্যবসায়ী সংগঠনের ভবনের ভেতরে কীভাবে গেল এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে। একই সঙ্গে ভবনটি কারা ব্যবহার করতেন, সেখানে অপরাধীদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল কি না এবং হত্যাকাণ্ডের পর আসামিরা কেন ওই স্থানটিকে মোটরসাইকেল রাখার জন্য নিরাপদ মনে করেছিল এসব বিষয় নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
গত ৪ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে চাষাঢ়া এলাকায় শুভ দাসকে ডেকে নিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় সুমন, সিজান ও সোহানকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। পরে রিমান্ডে থাকা সুমনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র ও অন্যান্য আলামত উদ্ধারে অভিযান চালানো হয়।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, হত্যা ও মাদকসহ সাতটি মামলার আসামি অনিক ও সুমনের নেতৃত্বে শুভ দাসকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। ঘটনার দিন ১০টি ইয়াবার বিনিময়ে শুভর সহযোগী সোহানকে ব্যবহার করে তাকে ঘটনাস্থলে ডেকে আনার অভিযোগ রয়েছে। পরে অনিক ও অহিদের নেতৃত্বে ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এ সময় অনিক ও অহিদ শুভকে গুলি করে হত্যা করে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
রিমান্ডে সুমনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রামকৃষ্ণ মিশনের সামনের গাছের ঝোপ থেকে একটি সাদা বাজারের ব্যাগে রাখা রিভলভার উদ্ধার করা হয়। ওই অস্ত্র দিয়েই শুভকে গুলি করা হয়েছিল বলে সুমন পুলিশকে জানিয়েছে।
এরপরই হত্যায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল হোসিয়ারী সমিতি ভবনের ভেতর থেকে উদ্ধারের ঘটনায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে ভবনটি।
বাংলাদেশ হোসিয়ারী এসোসিয়েশনের নেতাদের অভিযোগ, মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের একটি অফিসকক্ষ জোরপূর্বক দখল করে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করছেন।
২০২৫ সালের ৭ আগস্ট বাংলাদেশ হোসিয়ারী এসোসিয়েশনের সভাপতি বদিউজ্জামান বদু নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপারের কাছে দেওয়া এক স্মারকলিপিতে ভবনটি উদ্ধারের দাবি জানান। স্মারকলিপিতে অভিযোগ করা হয়, অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু সংগঠনের অফিসকক্ষটি ব্যক্তিগত রাজনৈতিক কার্যালয় হিসেবে জোরপূর্বক দখল করে ব্যবহার করছেন। একই সঙ্গে সেখানে বিভিন্ন সময় মানুষকে ধরে এনে ভয়ভীতি দেখানো, মারধর এবং বেআইনি ও অনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগও তোলা হয়।
ব্যবসায়ী নেতাদের দাবি, তাদের নিজস্ব সম্পত্তি হওয়া সত্ত্বেও ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছে। প্রশাসনের কাছে লিখিতভাবে অভিযোগ জানানো হলেও এখনো তারা ভবনটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাননি।
ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাদের আরও অভিযোগ, ভবনটি টিপুর নিয়ন্ত্রণে থাকার কারণে সেখানে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের আনাগোনা বেড়েছে। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নির্ধারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শুভ দাস হত্যা মামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল ওই ভবনের ভেতর থেকে উদ্ধারের পর সেই অভিযোগই নতুন করে সামনে এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতরা কীভাবে একটি ব্যবসায়ী সংগঠনের ভবনে প্রবেশ করল? তারা সেখানে মোটরসাইকেল রাখার সুযোগ পেল কীভাবে? ভবনটির নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে কারা ছিলেন? আর আসামিরা কেন মনে করল যে সেখানে মোটরসাইকেল রাখলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সন্দেহের বাইরে থাকা সম্ভব হবে?
এদিকে বিএনপি নেতা টিপুর সঙ্গে শুভ হত্যা মামলার কথিত মাস্টারমাইন্ড অনিকের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে একটি ছবি বা কারও সঙ্গে পরিচিতি থাকাই কোনো অপরাধে সম্পৃক্ততার প্রমাণ নয়। টিপুর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য এবং তদন্তে পাওয়া তথ্যই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ হোসিয়ারী এসোসিয়েশনের সভাপতি বদিউজ্জামান বদু বলেন, মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু হোসিয়ারী সমিতি ভবনটি জোর করে দখল করে রেখেছেন। তারা ভবনটি উদ্ধারের জন্য প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন, কিন্তু এখনো কার্যকর সমাধান পাননি।
তিনি বলেন, টিপুর নিয়ন্ত্রণে থাকার কারণে সেখানে অপরাধীদের আনাগোনা রয়েছে বলে তারা অভিযোগ পেয়েছেন। শুভ দাস হত্যা মামলার আসামিদের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল ভবনের ভেতর থেকে উদ্ধারের ঘটনাকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন।
বদিউজ্জামান বদু বলেন, “আমরা প্রশাসনের কাছে আবারও যাব। হোসিয়ারী সমিতির সম্পত্তি হোসিয়ারী এসোসিয়েশনের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানাব।”
একদিকে ব্যবসায়ী সংগঠনের সম্পত্তি দখলের পুরোনো অভিযোগ, অন্যদিকে ভবনের ভেতর থেকে শুভ হত্যা মামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধার দুটি ঘটনা একই স্থাপনাকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তবে মোটরসাইকেলটি সেখানে কে রেখেছিল, কখন রাখা হয়েছিল, ভবনে কারা প্রবেশের সুযোগ পেয়েছিল এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ভবনটির কোনো যোগসূত্র আছে কি না এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তেই।
ফলে ‘হোসিয়ারী সমিতি ভবন’ ঘিরে দীর্ঘদিনের দখল-অভিযোগের পাশাপাশি শুভ দাস হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধারের ঘটনা এখন নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ভবনটি কি শুধু একটি দখল-বিতর্কের কেন্দ্র, নাকি এর আড়ালে আরও কোনো রহস্য রয়েছে সেটিই এখন নারায়ণগঞ্জের সচেতন মহলের আলোচনার বিষয়।

