গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে ক্রমেই দুর্বিষহ হয়ে উঠছে নারায়ণগঞ্জের জনজীবন। বাসাবাড়িতে দিনের পর দিন গ্যাসের চাপ না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে রান্নাবান্না, অন্যদিকে দফায় দফায় লোডশেডিংয়ে স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় জেলার শিল্পকারখানাগুলোতেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে জনজীবন ও অর্থনীতি—দুই দিকেই তৈরি হয়েছে চাপ। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই সংকটের সমাধান কবে হবে, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন নারায়ণগঞ্জবাসীর।
জেলার ফতুল্লা, পঞ্চবটী, সিদ্ধিরগঞ্জসহ নারায়ণগঞ্জ শহরের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের সংকট সবচেয়ে বেশি বলে অভিযোগ রয়েছে। দিনের অধিকাংশ সময় চুলায় গ্যাসের চাপ থাকে না। কোথাও গভীর রাতে সামান্য সময়ের জন্য গ্যাস এলেও সকাল হলেই আবার চাপ কমে যায়। এতে প্রতিদিনের রান্নাবান্না নিয়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে পরিবারগুলোকে।
গ্যাসের বিকল্প হিসেবে অনেক পরিবারকে এলপিজি সিলিন্ডার, কাঠের চুলা কিংবা ইন্ডাকশন স্টোভের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে সংসারের অতিরিক্ত খরচ। নিয়মিত গ্যাসের বিল পরিশোধের পাশাপাশি সিলিন্ডার কেনা কিংবা ইন্ডাকশন ব্যবহার করতে গিয়ে বিদ্যুৎ বিল বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে এ পরিস্থিতি চলায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতেও। জেলার বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাস নেওয়ার জন্য দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে। পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক চালককে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে গাড়ি চালানোর সময় কমে যাওয়ার পাশাপাশি আয়-রোজগারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
অন্যদিকে, বিদ্যুৎ সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। দফায় দফায় লোডশেডিংয়ের কারণে বাসাবাড়ির পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকলে অনেক প্রতিষ্ঠানকে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে জ্বালানি ব্যয় ও পরিচালন খরচ।
নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলেও গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব স্পষ্ট। প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ না থাকায় ডাইং, নিটিং ও টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। স্বাভাবিক চাপ না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে মেশিনের পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন কমার পাশাপাশি বাড়ছে প্রতি ইউনিট পণ্যের উৎপাদন খরচ।
কারখানা সচল রাখতে অনেক উদ্যোক্তাকে অতিরিক্ত ব্যয়ে ডিজেল জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং ব্যবসায়িক চাপও বাড়ছে। দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে শ্রমিকদের ওপরও। অনেক প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত সময় কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় শ্রমিকদের আয় কমছে। ফলে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট এখন শুধু জ্বালানি সরবরাহের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে মানুষের আয়-রোজগার ও জীবনযাত্রার বিষয়টিও।
শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জে গ্যাসের চাহিদা দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে শিল্পকারখানার পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক আবাসিক গ্রাহক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সরবরাহে সামান্য ঘাটতিও দ্রুত বড় ধরনের জনদুর্ভোগে রূপ নেয়। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
সংকট মোকাবিলায় গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো এবং এলএনজি সরবরাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার আশ্বাস দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে তার সুফল কতটা মিলছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। দিনের পর দিন একই ধরনের ভোগান্তি চলতে থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রশ্ন—আর কতদিন এভাবে চলবে? নিয়মিত গ্যাসের বিল দেওয়ার পরও কেন বাসাবাড়িতে পর্যাপ্ত গ্যাস থাকবে না, শিল্পকারখানায় কেন প্রয়োজনীয় চাপ পাওয়া যাবে না এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন স্বাভাবিক রাখা যাচ্ছে না—এসব প্রশ্নের দ্রুত সমাধান চান ভুক্তভোগীরা।
গ্যাস ও বিদ্যুতের এই দ্বৈত সংকটের স্থায়ী সমাধান না হলে নারায়ণগঞ্জের জনজীবন ও শিল্পখাত—দুই ক্ষেত্রেই সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এখন নারায়ণগঞ্জবাসীর একটাই প্রশ্ন—গ্যাস-বিদ্যুতের এই ভোগান্তি কমবে কবে?

