নারায়ণগঞ্জ শহরকে হকারমুক্ত করতে আবারও কঠোর অবস্থানে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক)। গত কয়েক দিনে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদে মাঠে সক্রিয় হয়েছে নাসিকের উচ্ছেদকারী টিম। তবে অভিযান যতটা জোরালো হচ্ছে, ততই সামনে আসছে হকারদের বাধা ও পাল্টা প্রতিরোধ। সর্বশেষ উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে হকারদের সঙ্গে নাসিকের কর্মীদের ধস্তাধস্তির ঘটনায় পরিস্থিতি মারমুখী হয়ে ওঠে।
গত সোমবার (২৪ আগস্ট) বিকেলে নগরীর বিবি রোডে হকার উচ্ছেদ অভিযান চালায় নাসিক। অভিযান শেষে সন্ধ্যার দিকে আবারও কয়েকটি স্থানে হকাররা ফুটপাত দখল করে বসেছেন এমন অভিযোগে রাত সাড়ে ৭টার দিকে জাকির সুপার মার্কেটের সামনে অভিযান চালানো হয়। এ সময় নাসিকের উচ্ছেদকারী টিমের সঙ্গে হকারদের ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পরে সদর থানা পুলিশ নাসিকের উচ্ছেদকারী টিমকে ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে বলে।
নাসিকের উচ্ছেদ টিমের প্রধান সম্রাট হাসান সুজনের ভাষ্য, বিকেলে বিবি রোড থেকে হকারদের সরিয়ে দেওয়া হলেও সন্ধ্যার পর তারা ফের ফুটপাতে বসে যান। প্রশাসক ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নির্দেশে পুনরায় অভিযান চালাতে গেলে হকারদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়।
হকার উচ্ছেদ নারায়ণগঞ্জে নতুন কোনো ঘটনা নয়। চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল নাসিকের বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। চাষাঢ়া জিয়া হল এলাকা থেকে শুরু হওয়া ওই অভিযানে জেলা প্রশাসন, পুলিশসহ বিভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। লক্ষ্য ছিল নগরীর প্রধান সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করে যানজট ও জনদুর্ভোগ কমানো।
কিন্তু অভিযানের কয়েক দিনের মধ্যেই বিভিন্ন স্থানে আবার হকাররা বসে পড়েন। ফলে নাসিকের উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে একবার উচ্ছেদ করার পরও কেন স্থায়ীভাবে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা যাচ্ছে না?
এপ্রিলের অভিযানের পর মে মাসেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়। ৪ মে উচ্ছেদ অভিযানের সময় নাসিকের কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। নাসিকের উচ্ছেদ কর্মীদের দাবি অনুযায়ী, ওই ঘটনায় দুই কর্মচারীসহ অন্তত পাঁচজন আহত হন। পরে ৫ মে নাসিক কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগে ১০ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
এরপর ৮ জুন কালিবাজার এলাকায় আবারও উচ্ছেদ অভিযানে হকারদের বাধার মুখে পড়তে হয় নাসিককে। সেদিন নাসিক প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান নিজেই অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। হকারদের প্রতিবাদ ও বাধার চেষ্টায় সেখানে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং অভিযান চালানো হয়।
দীর্ঘদিনের হকার সমস্যা সমাধানে নাসিক প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছেন। ১৩ এপ্রিল থেকে নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান চালানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। নগরীর যানজট ও ফুটপাত দখলমুক্ত করাকে প্রশাসকের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, নাসিক একদিকে উচ্ছেদ করছে, অন্যদিকে উচ্ছেদ করা স্থানেই কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের ব্যবধানে আবার হকার বসে যাচ্ছে। ফলে অভিযান অনেকটা ‘উচ্ছেদ-বসা-আবার উচ্ছেদ’-এর চক্রে আটকে পড়েছে।
শুধু উচ্ছেদ নয়, হকারদের পুনর্বাসনের উদ্যোগও নিয়েছে নাসিক। সম্প্রতি প্রকৃত হকার চিহ্নিত করে প্রায় এক হাজার হকারের তালিকা তৈরির উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে। নাসিক প্রশাসনের বক্তব্য, প্রকৃত হকারদের নির্দিষ্ট স্থানে পুনর্বাসনের পাশাপাশি প্রধান সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা হবে।
তবে পুনর্বাসনের স্থান নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে। বঙ্গবন্ধু সড়কের হকারদের পুনর্বাসনের জন্য রেললাইনের পাশের জমি প্রস্তুতের উদ্যোগ নেওয়া হলেও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সেখানে আপত্তি জানিয়েছে। ফলে পুনর্বাসন প্রক্রিয়াতেও জটিলতা দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে হকার নেতাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে উচ্ছেদ অভিযান চললেও তাদের স্থায়ী আয়ের বিকল্প তৈরি করা হয়নি। নারায়ণগঞ্জ মহানগর জাতীয়তাবাদী হকার দলের সভাপতি মিজানুর রহমান রনি দাবি করেছেন, চার মাসের অভিযানে হকাররা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। তাদের দাবি, প্রকৃত হকারদের তালিকা করে নির্দিষ্ট স্থানে বসার সুযোগ দেওয়া হোক।
হকারদের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হলে তারা নির্দিষ্ট স্থানে যেতে রাজি। কিন্তু পুনর্বাসন ছাড়া শুধু উচ্ছেদ করা হলে তারা তা মেনে নেবেন না।
সর্বশেষ ধস্তাধস্তির ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—নাসিক কি এবার কঠোরভাবে হকারদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে? নাকি আগের মতোই অভিযান শেষ হওয়ার পর আবারও ফুটপাত দখল হয়ে যাবে?
নাসিক প্রশাসনের লক্ষ্য একদিকে নগরীর প্রধান সড়ক ও ফুটপাত পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা, অন্যদিকে প্রকৃত হকারদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে তাদের জীবিকার সুযোগ তৈরি করা। কিন্তু মাঠপর্যায়ে উচ্ছেদকারী দল ও হকারদের মধ্যে বারবার সংঘাত পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
এ অবস্থায় শুধু অভিযান চালিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে, নাকি পুনর্বাসন, নির্দিষ্ট হকার জোন, নিয়মিত নজরদারি এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে উঠবে—এটাই এখন নারায়ণগঞ্জবাসীর বড় প্রশ্ন।
একদিকে নাসিকের ঘোষণা ফুটপাত পথচারীদের জন্য; অন্যদিকে হকারদের অবস্থান—পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ নয়। এই দুই অবস্থানের সংঘাতেই গত কয়েক দিনে নারায়ণগঞ্জের হকার ইস্যু আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

