বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে একসময় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের মধ্যে যে রাজনৈতিক ঐক্যের দৃশ্য দেখা গিয়েছিল, সময়ের ব্যবধানে সেই সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে তিন পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক দূরত্ব, পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এবং কর্মসূচিকে ঘিরে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের পর নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে এই বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি তোলারাম কলেজকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা এবং বিভিন্ন সভা-সমাবেশে একে অপরকে লক্ষ্য করে দেওয়া বক্তব্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। একই সঙ্গে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপি ও এনসিপির নেতাদের পাল্টাপাল্টি অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে। ফলে রাজনৈতিক মহলে এখন প্রশ্ন উঠছে—এই দূরত্ব কি শেষ পর্যন্ত সমঝোতার পথে যাবে, নাকি নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি সংঘাতের দিকে এগোবে?
গত ১ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ মহানগর জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে ‘জুলাই সনদ’ ও গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের দাবিতে গণমিছিল অনুষ্ঠিত হয়। বিকেলে শহরের চাষাঢ়া মিশনপাড়া মসজিদসংলগ্ন সড়ক থেকে মিছিলটি শুরু হয়ে মন্তলপাড়া পুল এলাকায় গিয়ে শেষ হয়।
মিছিলের সমাপনী বক্তব্যে মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমীর আব্দুল জব্বার বিএনপির সমালোচনা করে বলেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা ফ্যাসিবাদের চরিত্র দেখতে পাচ্ছেন। তিনি দাবি করেন, আড়াইহাজারে জামায়াতের কর্মীদের ওপর বিএনপির নেতাকর্মীদের হামলার ঘটনা ঘটেছে। একই কর্মসূচির সময়সূচি নিয়ে দুই দলের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল বলেও তিনি বক্তব্যে উল্লেখ করেন।
আব্দুল জব্বার বলেন, জামায়াতে ইসলামী যখন মঞ্জুরুল ইসলাম স্টেডিয়ামে কর্মসূচির ঘোষণা দেয়, তখন একই সময়ে বিএনপিও কর্মসূচি ঘোষণা করে। পরে জামায়াত সময় পরিবর্তন করলেও তাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা এবং বাড়িঘরে হামলার অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনায় তিনি বিএনপির নেতাকর্মীদের সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান।
জামায়াত নেতার এমন বক্তব্যের পর বিএনপির সঙ্গে দলটির রাজনৈতিক দূরত্ব আরও প্রকাশ্যে আসে। এর আগে আড়াইহাজারে একই সময়ে পৃথক কর্মসূচি ঘিরে দুই দলের নেতাকর্মীরা মুখোমুখি অবস্থানে চলে যাওয়ার ঘটনাও পরিস্থিতির উত্তাপ বাড়িয়েছে।
অন্যদিকে এনসিপি নেতাদের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিএনপির সঙ্গেও নতুন করে বিরোধ তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ বিভিন্ন রাজনীতিবিদকে নিয়ে এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ দলের নেতাদের বক্তব্যের প্রতিবাদে ১ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপি বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করে।
শহরের মিশনপাড়া এলাকার হোসিয়ারি অ্যাসোসিয়েশনের সামনে থেকে মিছিলটি শুরু হয়ে চাষাঢ়া ও নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাব এলাকা প্রদক্ষিণ করে ২ নম্বর রেলগেট এলাকায় গিয়ে শেষ হয়।
সমাবেশে বিএনপি নেতারা এনসিপির বিভিন্ন বক্তব্যের সমালোচনা করেন এবং নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে নারায়ণগঞ্জে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন। ভবিষ্যতে তিনি নারায়ণগঞ্জে এলে তাকে প্রতিহত করার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়। সমাবেশ থেকে দেওয়া কিছু বক্তব্য ও হুমকি নিয়ে পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে সমালোচনা দেখা দেয়।
বিএনপির এমন বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় জেলা এনসিপির সাংগঠনিক সম্পাদক নিরব রায়হান পাল্টা বক্তব্য দেন। তিনি বিএনপির নেতাদের বক্তব্যকে আওয়ামী লীগের অতীত রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে তুলনা করে সমালোচনা করেন। তার দাবি, বিরোধী রাজনৈতিক মতকে দমন করার ভাষা পরিবর্তন না হলে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন আসবে না।
তিনি আরও বলেন, আন্দোলনের মাধ্যমে যারা জুলুম ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, তাদের কারওই পরবর্তীতে জুলুমবাজ হয়ে ওঠা উচিত নয়। এনসিপিকে দমন করার হুমকির পরিণতি কী হতে পারে, তা সময়ই বলে দেবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে একই দিনে আড়াইহাজারে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর পাল্টাপাল্টি মিছিলকে কেন্দ্র করে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আড়াইহাজার বাজার এলাকায় দুই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মিছিল কাছাকাছি চলে এলে নেতাকর্মীরা মুখোমুখি অবস্থান নেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয়। পুলিশ দুই পক্ষের মাঝখানে অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখে। শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের সংঘর্ষ ছাড়াই দুই পক্ষের কর্মসূচি শেষ হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্দোলনের সময়কার অভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান এখন আর আগের মতো নেই। নির্বাচন, নেতৃত্ব, সাংগঠনিক বিস্তার এবং মাঠের আধিপত্যকে কেন্দ্র করে তিন রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে নতুন করে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। ফলে একে অপরের কর্মসূচির প্রতি পাল্টা কর্মসূচি, বক্তব্যের জবাবে বক্তব্য এবং মাঠপর্যায়ে মুখোমুখি অবস্থানের ঘটনা বাড়ছে।
তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে এই উত্তেজনা কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। কারণ পাল্টাপাল্টি বক্তব্য যদি মাঠের কর্মসূচিতে আরও তীব্র আকার ধারণ করে, তাহলে তা যেকোনো সময় সংঘাতে রূপ নিতে পারে। আবার রাজনৈতিক সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির পারস্পরিক সম্পর্ক আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। সমঝোতার মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বর্তমান উত্তেজনা সরাসরি সংঘাতে গড়াবে সেদিকেই নজর রয়েছে স্থানীয় রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের।

