নারায়ণগঞ্জে বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক দুর্বলতা, দীর্ঘদিন ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি বহাল থাকা এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে একের পর এক বিতর্ক তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন ঘটনায় দলীয় নেতাকর্মীদের নাম আলোচনায় আসায় মূল দলও অস্বস্তিতে পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দলীয় সূত্র বলছে, কেন্দ্রীয় বিএনপি ইতোমধ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে মেয়াদোত্তীর্ণ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। দলটির ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মধ্যে অধিকাংশ কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও দীর্ঘদিন নতুন নেতৃত্ব গঠন করা হয়নি। ফলে সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে এবং তৃণমূল পর্যায়ে নেতৃত্ব বিকাশও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, শ্রমিক দল, ছাত্রদল এবং কৃষকদলের বর্তমান সাংগঠনিক পরিস্থিতি নিয়েও রয়েছে নানা আলোচনা। স্থানীয় নেতাদের অভিযোগ, অধিকাংশ সংগঠনে দীর্ঘদিন ইউনিট কমিটি গঠন না হওয়ায় মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও অভ্যন্তরীণ বিভক্তিও প্রকট আকার ধারণ করেছে।
বিশেষ করে যুবদলকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক বিতর্ক সামনে এসেছে। মহানগর যুবদলের একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে কে এম মাজহারুল ইসলাম জোসেফ নামে এক ব্যক্তিকে বর্তমান মহানগর যুবদলের পদধারী নেতা নন বলে উল্লেখ করা হয়। এরপর বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
এদিকে জেলা যুবদলের এক শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে জেলা বিএনপির সদস্য অকিল উদ্দিন ভূঁইয়াকে মারধরের অভিযোগ নিয়েও সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি জেলা ও মহানগর যুবদলের নেতৃত্বের মধ্যে মতবিরোধ, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা এবং একে অপরকে কোণঠাসা করার অভিযোগও রয়েছে বলে দলীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশ দাবি করছে।
স্বেচ্ছাসেবক দলেও একই ধরনের সংকট রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়কের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ এবং জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয়হীনতার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। সংগঠনটির কার্যক্রমেও এর প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শ্রমিক দল নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। দলীয় নেতাদের একাংশের ভাষ্য, সাংগঠনিক কার্যক্রমের চেয়ে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে নেতাদের নাম বেশি আলোচিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে মহানগর শ্রমিক দলের এক শীর্ষ নেতা চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তারও হয়েছেন।
অন্যদিকে প্রায় দুই বছর ধরে জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকায় সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। নতুন নেতৃত্ব না থাকায় অনেকেই নিজেদের পরিচয়ে রাজনীতি করছেন, যা সংগঠনের শৃঙ্খলার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন নেতাকর্মীরা।
দলীয় তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৯ আগস্ট মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক হিসেবে মনিরুল ইসলাম সজল এবং সদস্য সচিব হিসেবে শাহেদ আহমেদ দায়িত্ব পান। একই দিনে জেলা যুবদলের আহ্বায়ক হন সাদেকুর রহমান সাদেক এবং সদস্য সচিব হন মশিউর রহমান রনি।
একই সময়ে মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক হন সাখাওয়াত হোসেন রানা ও সদস্য সচিব মমিনুর রহমান বাবু। জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পান মাহবুব হোসেন এবং সদস্য সচিব সালাউদ্দিন সাল্লু।
এছাড়া ২০২২ সালে জেলা ও মহানগর শ্রমিক দলের কমিটি গঠন করা হলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করা এবং ইউনিট কমিটি গঠনে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
দলীয় নেতাদের মতে, দীর্ঘদিন একই নেতৃত্ব বহাল থাকলেও অধিকাংশ সংগঠন ইউনিট কমিটি গঠন, সাংগঠনিক সম্প্রসারণ এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরিতে প্রত্যাশিত সফলতা দেখাতে পারেনি। বরং বিভিন্ন সময়ে নেতাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগে সংগঠনগুলো বারবার সমালোচনার মুখে পড়েছে।
এ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় বিএনপি শিগগিরই মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো পুনর্গঠন করতে পারে বলে দলীয় সূত্রে আভাস পাওয়া গেছে। নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, তৃণমূলকে সক্রিয় করা এবং বিতর্ক কমানোর লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তবে অভিযুক্ত নেতাদের বক্তব্য বা বিএনপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় দায়িত্বশীল নেতাদের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আরও ভারসাম্যপূর্ণ হবে। সংবাদ প্রকাশের আগে সেই বক্তব্য যুক্ত করা সাংবাদিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ।

