দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, নেতৃত্বের বিরোধ, সাংগঠনিক দুর্বলতা, নিষ্ক্রিয়তা ও একের পর এক বিতর্কের কারণে নারায়ণগঞ্জে বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। জেলা ও মহানগর পর্যায়ের একাধিক ইউনিটে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি, আহ্বায়ক কমিটির দীর্ঘসূত্রতা, পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনে বিলম্ব এবং মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রমের স্থবিরতা সংগঠনগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় বিএনপি সারাদেশের মতো নারায়ণগঞ্জেও অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বলে দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের এই পদক্ষেপকে ঘিরে জেলা ও মহানগরের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য নেতৃত্ব পরিবর্তনকে সামনে রেখে পদপ্রত্যাশী নেতারাও এখন তৎপর হয়ে উঠেছেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সাংগঠনিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী ও গতিশীল করতে মেয়াদোত্তীর্ণ এবং দীর্ঘদিনের আহ্বায়ক কমিটিগুলো পুনর্বিন্যাসের নির্দেশনা দিয়েছেন। এর অংশ হিসেবে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল, শ্রমিক দল, কৃষক দলসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের বর্তমান কার্যক্রম মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
তৃণমূলের অভিযোগ, অনেক কমিটি ঘোষণার পর প্রত্যাশিত সাংগঠনিক গতি তৈরি করতে পারেনি। ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ও থানা পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন হয়নি, নিয়মিত কর্মসূচি নেই, নতুন কর্মী সৃষ্টি ও সাংগঠনিক বিস্তারেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। ফলে আন্দোলন-সংগ্রামের সময়ে মাঠে কাঙ্ক্ষিত শক্তি প্রদর্শন করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
নারায়ণগঞ্জে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে যুবদলের সাংগঠনিক অবস্থা। সম্প্রতি মহানগর যুবদলের সাবেক ছাত্রনেতা কে এম মাজহারুল ইসলাম জোসেফকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় যুবদলের দেওয়া একটি বিজ্ঞপ্তি দলীয় অঙ্গনে নানা আলোচনা ও মতভেদের সৃষ্টি করে। বিষয়টি নিয়ে জেলা ও মহানগরের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে ভিন্নমত প্রকাশ পায়।
অন্যদিকে জেলা যুবদলের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিরোধ, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার অভিযোগও আলোচনায় রয়েছে। এসব ঘটনায় সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে করছেন অনেক নেতাকর্মী।
শুধু যুবদল নয়, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল ও শ্রমিক দলেও নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, সাংগঠনিক নিষ্ক্রিয়তা এবং বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকায় নতুন নেতৃত্ব বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নিয়মিত কাউন্সিল না হওয়া, দীর্ঘদিন একই নেতৃত্ব বহাল থাকা এবং অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের অভাবের কারণে অনেক সংগঠন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। ফলে দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন, জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়াও ধীর হয়ে পড়েছে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বর্তমানে সাংগঠনিক কার্যক্রম, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, জনসম্পৃক্ততা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিকে গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করছে। ত্যাগী, পরিচ্ছন্ন ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বকে সামনে আনার বিষয়ে কেন্দ্র থেকে সুস্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, সম্প্রতি তারেক রহমান বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে সংগঠনগুলোকে আরও কার্যকর, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও জনমুখী করার নির্দেশনা দিয়েছেন। একই সঙ্গে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত কিংবা নিষ্ক্রিয় নেতাদের বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথাও আলোচনায় এসেছে বলে দলীয় সূত্রের দাবি।
সম্ভাব্য পুনর্গঠনকে সামনে রেখে জেলা ও মহানগরের বিভিন্ন পর্যায়ের পদপ্রত্যাশী নেতারা কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন। আন্দোলন-সংগ্রামে নিজেদের ভূমিকা, কারাবরণ, সাংগঠনিক অবদান এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তুলে ধরে নতুন কমিটিতে স্থান পাওয়ার চেষ্টা করছেন তারা।
একাধিক নেতা মনে করছেন, এবার বয়স, গ্রহণযোগ্যতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং মাঠে সক্রিয়তার ভিত্তিতেই নেতৃত্ব নির্বাচন হতে পারে। সে কারণেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে নীরব প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।
দলীয় সূত্রগুলোর ধারণা, কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী খুব শিগগিরই নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসতে পারে। নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে সংগঠনগুলোকে আরও গতিশীল, সুসংগঠিত ও জনসম্পৃক্ত করার লক্ষ্যেই কেন্দ্রীয় বিএনপি এ উদ্যোগ নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

