নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত একটি নাম অ্যাডভোকেট শাখাওয়াত হোসেন খান। ছাত্ররাজনীতি দিয়ে রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করে তিনি একাধারে আইনজীবী, বিএনপির সংগঠক, আন্দোলনের রাজপথের নেতা এবং বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রায় চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে তিনি দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, আইন পেশা, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব সব ক্ষেত্রেই সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।
আশির দশকের শুরুতে জাতীয়তাবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন শাখাওয়াত হোসেন খান। সে সময় বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন তাকে আকৃষ্ট করে। প্রথমদিকে পোস্টার লাগানো, লিফলেট বিতরণ, সভা-সমাবেশে অংশগ্রহণ এবং তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন গড়ে তোলার কাজের মাধ্যমে রাজনৈতিক কার্যক্রমে যুক্ত হন।
পরবর্তীতে তিনি ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় হন।১৯৮০-৮১ সালে তিনি মুন্সিগঞ্জ জেলা যুবদলের সহ-সভাপতি ছিলেন। ছাত্রজীবনেই সংগঠক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। বিভিন্ন আন্দোলন, ছাত্রসমাবেশ এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তার উপস্থিতি ছিল নিয়মিত। এরপর যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনীতির পাশাপাশি আইন পেশাকে বেছে নেন শাখাওয়াত হোসেন খান। নারায়ণগঞ্জ আদালতে আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই দক্ষ আইনজীবী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সঙ্গে যুক্ত থেকে সংগঠনের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন এবং জেলা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি নারায়ণগঞ্জ আইনজীবী সমিতির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলে।
২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত সাত খুন মামলায় বাদীপক্ষের অন্যতম আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি জাতীয় পর্যায়েও আলোচনায় আসেন। ওই মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় তার ভূমিকা আইনজীবী মহলে প্রশংসিত হয়।
ছাত্রদল ও যুবদলের রাজনীতি শেষে তিনি বিএনপির মূলধারার রাজনীতিতে সক্রিয় হন। দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠনকে শক্তিশালী করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন।
তিনি জেলা বিএনপির সহ-আইনবিষয়ক সম্পাদক, মহানগর বিএনপির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে আহ্বায়ক এবং অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপুকে সদস্য সচিব করে ৪১ সদস্য বিশিষ্ট মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন দেয়।
গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে বিরোধী রাজনীতির অন্যতম মুখ ছিলেন শাখাওয়াত হোসেন খান। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির পাশাপাশি স্থানীয় বিভিন্ন ইস্যু নিয়েও আন্দোলন গড়ে তুলেছেন।
নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক হওয়ার পর দলকে সাংগঠনিকভাবে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন তিনি। থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিট পর্যায়ে কমিটি গঠন, নেতাকর্মীদের সক্রিয় করা এবং কেন্দ্রীয় নির্দেশনা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখেন।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পান অ্যাডভোকেট শাখাওয়াত হোসেন খান। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই নগরীর বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন এবং কর্মকর্তাদের নিয়ে ধারাবাহিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন। জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল উদ্ধার ও খনন,নগরীর পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার, মশক নিধন কার্যক্রম বাড়ানো, ভাঙাচোরা সড়ক সংস্কার, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, নগরীর যানজট নিরসনে উদ্যোগ, নাগরিক সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
তিনি বিভিন্ন সময় বলেছেন, প্রশাসক হিসেবে তার পরিচয় রাজনৈতিক নয়, নাগরিক সেবক হিসেবে কাজ করাই তার প্রধান লক্ষ্য।
শাখাওয়ত হোসেন খান দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন ওয়ার্ডে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হয়। জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল পরিষ্কার, ড্রেন সংস্কার এবং ময়লা অপসারণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়।
নগরবাসীর অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। কর আদায়ে স্বচ্ছতা, প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি এবং নাগরিকদের সরাসরি অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থাও চালু করা হয়।
শাখাওয়াত হোসেন খান বিভিন্ন বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন, তিনি ব্যক্তি নয়—প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন। তার মতে, জনগণের আস্থা অর্জনই একজন রাজনৈতিক কর্মীর সবচেয়ে বড় অর্জন।
তিনি আরও বলেছেন, দলীয় কর্মী হিসেবে দীর্ঘদিন রাজপথে আন্দোলন করেছেন, এখন প্রশাসনিক দায়িত্বে থেকে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে চান।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি যেমন সংগঠক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন, তেমনি প্রশাসক হিসেবে তাকে নানা চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলো হলো- দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধান, নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিক করা, যানজট কমানো, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, নগরবাসীর আস্থা ধরে রেখে কার্যকর নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা।
রাজপথের একজন কর্মী থেকে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এবং পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট শাখাওয়াত হোসেন খানের রাজনৈতিক পথচলা দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড এবং আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি একজন আইনজীবী ও প্রশাসক হিসেবে তার বর্তমান দায়িত্বও নগরবাসীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সামনের দিনগুলোতে প্রশাসনিক দক্ষতা, সুশাসন এবং নগর উন্নয়নের মাধ্যমে তিনি কতটা সফল হতে পারেন, সেটিই এখন নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রধান প্রত্যাশা।

