অনেকটা ডাকঢোল পিটিয়েই কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করেছিল নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর যুবদল। তবে প্রত্যাশিত সংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতি না থাকায় শক্তি প্রদর্শনের সেই চেষ্টা সফল হয়নি বলে মনে করছেন তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী।
তাদের ভাষ্য, নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর যুবদল যৌথভাবে কর্মসূচি পালন করলেও কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনে যে ধরনের বিশাল শো-ডাউন হওয়ার কথা ছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। উপস্থিতি ছিল তুলনামূলকভাবে কম, যা সংগঠনের বর্তমান সাংগঠনিক দুর্বলতাকেই সামনে এনে দিয়েছে বলে তারা মনে করছেন।
দীর্ঘ আড়াই বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর যুবদল সাংগঠনিক কার্যক্রমে প্রত্যাশিত গতি আনতে পারেনি বলে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যেই আলোচনা রয়েছে। আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণার পর থেকেই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, পদবঞ্চিতদের ক্ষোভ, ইউনিট কমিটি গঠনে ধীরগতি এবং নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে। ফলে সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর পরিবর্তে বিভক্তির চিত্রই বেশি দৃশ্যমান হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) জেলা ও মহানগর যুবদলের যৌথ উদ্যোগে ‘অপপ্রচার ও শিষ্টাচারবহির্ভূত রাজনীতির বিরুদ্ধে’ প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে কেন্দ্রীয় যুবদলের সহ-সভাপতি ইয়াসিন ফেরদৌস মুরাদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবুল মনসুর খান দীপক এবং সাজেদুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনে সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী হিসেবে তুলে ধরতেই এই আয়োজনকে ঘিরে নেতাদের ব্যাপক তৎপরতা ছিল বলে দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
এর আগে কর্মসূচি সফল করতে নগরীর সাইনবোর্ড এলাকার একটি রেস্টুরেন্টে প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব নেতাকর্মীদের উদ্দেশে ঐক্যের বার্তা দিলেও দীর্ঘদিন ধরে পদ-পদবী না পাওয়া নেতাকর্মীদের মধ্যে সেই আশ্বাসে আস্থার সংকট রয়েছে বলে জানা গেছে।
দলীয় সূত্র জানায়, বর্তমানে জেলা ও মহানগর যুবদলের সাংগঠনিক কাঠামোর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে রয়েছে। জেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক পদ দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর। অন্যদিকে মহানগর যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক, সাবেক এমপি আবদুল মান্নানের ছেলে সজীব চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার এবং পরবর্তীতে দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর থেকে ওই পদও কার্যত নিষ্ক্রিয় রয়েছে।
অন্যদিকে মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম সজলকে ঘিরে মহানগর বিএনপির সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়েও আলোচনা চলছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সামনে মহানগর বিএনপির নতুন কমিটি গঠনের সম্ভাবনা থাকায় যুবদলের ভেতরেও অবস্থান শক্ত করার প্রতিযোগিতা আরও বেড়েছে।
দলীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ইউনিট কমিটি গঠন না হওয়া, পদবঞ্চিতদের মূল্যায়ন না করা এবং নিয়মিত সাংগঠনিক কার্যক্রমের অভাবে তৃণমূলে হতাশা তৈরি হয়েছে। ফলে আগের মতো বড় কর্মসূচিতে ব্যাপক নেতাকর্মীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা নিয়েও সংশয় রয়েছে। একাধিক সূত্রের দাবি, কয়েকটি থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতারাও এবারের কর্মসূচিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেননি। তবে এ দাবির স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে একই দিনে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকেই পদবঞ্চিতদের ক্ষোভ, পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এবং নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। মহানগর যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন হলেও জেলা যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি এখনও ঘোষণা হয়নি। এতে পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে অসন্তোষ আরও বেড়েছে।
এছাড়া অতীতে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে জেলা ও মহানগর যুবদলের একাধিক নেতাকে কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে শোকজ করা হয়েছে। গত বছরের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও ঝুট ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে যুবদলের কয়েকজন নেতার নাম আলোচনায় এসেছে বলে বিরোধী রাজনৈতিক মহল অভিযোগ করে আসছে। যদিও এসব অভিযোগ দলটির পক্ষ থেকে বরাবরই অস্বীকার করা হয়েছে।
এদিকে জাতীয়তাবাদী যুবদলের ১৫১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে নারায়ণগঞ্জের কোনো নেতা স্থান না পাওয়াও স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষের আরেকটি কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসন, পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক কাঠামো গঠন এবং তৃণমূলের কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন ছাড়া নারায়ণগঞ্জে যুবদলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করা কঠিন হবে। কেন্দ্রীয় নেতাদের সফর ঘিরে সাময়িক ঐক্যের চিত্র দেখা গেলেও, স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন কার্যকর সাংগঠনিক উদ্যোগ, নেতৃত্বের সমন্বয় এবং তৃণমূলের আস্থা পুনরুদ্ধার।

