রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে দুই পা হারিয়েছিলেন ইউক্রেনের সেনা কস্তিয়ান্তিন ভ্লাসেনকো। বাঁচার আশায় নিজের অবশিষ্ট পায়ের পাতাটিও ছুরি দিয়ে কেটে ফেলেন তিনি। এরপর প্রায় আট মাস একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুলের নিচে বয়লারের পাশে গর্তে আশ্রয় নিয়ে ছিলেন।
শেষ পর্যন্ত তাকে উদ্ধার করা হয় বিশাল একটি ড্রোনের সাহায্যে। সেই ড্রোনে ঝুলে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে নিরাপদ স্থানে পৌঁছান ৪৯ বছর বয়সী এই সেনা।
গত ৪ অক্টোবরের এই অভিযানকে যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো সেনাকে আকাশপথে ড্রোন দিয়ে উদ্ধারের প্রথম জানা ঘটনা বলে দাবি করেছেন ইউক্রেনের সামরিক কর্মকর্তারা।
পা কেটে বাঁচার চেষ্টা
ভ্লাসেনকো ইউক্রেনের ৩০তম মেকানাইজড ব্রিগেডের সদস্য। দেশটির খারকিভ অঞ্চলের সম্মুখসারিতে দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি।
২০২৫ সালের মে মাসে তাকে যুদ্ধক্ষেত্রের একটি অবস্থানে পাঠানো হয়। সেখানে তার সঙ্গে ছিলেন ‘বাস্কি’ ছদ্মনামের এক সহযোদ্ধা।
দুজন একটি ছোট ভূগর্ভস্থ আশ্রয়ে থাকতেন। তাদের খাবার, পোশাক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী ড্রোনের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হতো।
গত বছরের শেষ দিকে তাদের জায়গায় নতুন সেনা পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ভ্লাসেনকোর ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের উদ্ধার করতে যাওয়া চার সেনাই রুশ হামলায় নিহত হন। এতে তাদের ফিরে আসার আশা কমে যায়।
পরে আশ্রয়স্থলে পানি ঢুকে পড়লে দুজনকে একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুলে আশ্রয় নিতে হয়। সেখানে খাবার ও শুকনো পোশাক সংগ্রহ করতে বের হলে রাশিয়ার একটি নজরদারি ড্রোন তাদের শনাক্ত করে।
এরপর আরেকটি ড্রোন হামলায় বাস্কি নিহত হন। সেদিন ছিল তার ৫০তম জন্মদিন।
হামলায় ভ্লাসেনকোর বাম পা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পড়ে গিয়ে ডান পায়েও গুরুতর আঘাত পান তিনি।
বয়লারের নিচে আট মাস
হামলার পর চলাফেরার ক্ষমতা প্রায় হারিয়ে ফেলেন ভ্লাসেনকো। স্কুলের পুরোনো বয়লারের নিচে প্রায় ৮০ বাই ৬০ সেন্টিমিটার জায়গার একটি গর্তে আশ্রয় নেন তিনি।
সেখানে ধীরে ধীরে তার বাম পায়ের ক্ষত পচতে থাকে। ডান পায়ের হাড়ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ক্ষত এতটাই গুরুতর ছিল যে হাড় বাইরে বেরিয়ে আসছিল।
একপর্যায়ে বেঁচে থাকার জন্য নিজের পায়ের পাতা নিজেই কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ছুরি দিয়ে পা কাটার পর রক্তপাত বন্ধ করতে ক্ষতস্থানে শক্ত করে বাঁধন দেন।
রয়টার্সকে ভ্লাসেনকো বলেন, পা তার শরীরের সঙ্গে ঝুলে থাকছিল এবং হাড় ক্রমেই বাইরে বেরিয়ে আসছিল। তাই তিনি নিজেই পা কেটে ফেলেন।
এরপর থেকে দুই পা হারানো অবস্থায় গর্তের মধ্যে দিন কাটাতে থাকেন তিনি।
উদ্ধার প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল
ইউক্রেনের সেনারা তাকে উদ্ধারের একাধিক চেষ্টা করেন। কিন্তু রুশ ড্রোনের নজরদারির কারণে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আহত সেনাদের সরিয়ে আনা অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল।
পিকআপ ট্রাক কিংবা সাঁজোয়া যান ব্যবহার করে উদ্ধার অভিযান চালানো সম্ভব হচ্ছিল না।
এমনকি চাকার বা ট্র্যাকযুক্ত চালকবিহীন স্থলযান পাঠিয়েও লাভ হয়নি। ভ্লাসেনকোর কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করা দুটি যানই রুশ ড্রোনের হামলায় ধ্বংস হয়ে যায়।
উদ্ধার অভিযানের পরিকল্পনায় যুক্ত এক ইউক্রেনীয় কর্মকর্তা বলেন, তখন অভিযানটি প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছিল।
পরে তারা স্থানীয় প্রতিষ্ঠান গুরজুফ ডিফেন্সের তৈরি একটি নতুন ভারী মালবাহী ড্রোনের কথা জানতে পারেন।
ছয়টি উল্লম্ব রোটরযুক্ত ড্রোনটি দেখতে বড় পোকামাকড়ের মতো। এটি সর্বোচ্চ ৯০ কেজি ওজন বহন করে প্রায় ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়তে পারে।
ভ্লাসেনকোকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিরাপদ স্থানে নিতে ড্রোনটির প্রায় ১৫ কিলোমিটার উড়তে হতো।
৭০ মিটার ওপরে ঝুলে উদ্ধার
অক্টোবরের শুরুর দিকে ভ্লাসেনকোর কাছে নিয়মিত সরবরাহের একটি প্যাকেট পৌঁছায়। সেখানে ছিল একটি বিশেষ নিরাপত্তাবেল্ট ও নির্দেশনামূলক ভিডিওসহ একটি ফোন।
পরিকল্পনাটি বুঝতে পেরে তিনি উদ্ধার অভিযানের জন্য প্রস্তুতি নেন।
৪ অক্টোবর তার কাছে পৌঁছায় বিশাল ছয় রোটরের ড্রোনটি। ভ্লাসেনকো একটি ধাতব সংযোগব্যবস্থার সাহায্যে ড্রোনের সঙ্গে যুক্ত বেল্টে নিজেকে আটকে নেন।
এরপর ড্রোনটি তাকে প্রায় ৭০ মিটার ওপরে তুলে নেয়।
উদ্ধারকারী ড্রোনটিকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে সঙ্গে ছিল আরও তিনটি ছোট ড্রোন। সেগুলোর কাজ ছিল রুশ হামলাকারী ড্রোনগুলোর মনোযোগ সরিয়ে দেওয়া।
এ ছাড়া ইউক্রেনের চারটি এফপিভি ড্রোন দল, কামান এবং বড় আকারের ড্রোন ব্যবহার করে রুশ ড্রোনের অবস্থানগুলোতে হামলা চালানো হয়। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলে এই সহায়তামূলক অভিযান।
শেষ পর্যন্ত প্রায় ১৫ মিনিটের উড্ডয়ন শেষে উদ্ধারকারী ড্রোনটি নিরাপদ স্থানে পৌঁছায়। নিরাপত্তার কারণে ওই স্থানের সুনির্দিষ্ট অবস্থান প্রকাশ করেনি ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী।
‘বেঁচে ফেরার আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম’
উদ্ধারের পর ভ্লাসেনকোকে খারকিভের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে শয্যায় শুয়ে নিজের দুই পায়ের ব্যান্ডেজ করা অবশিষ্ট অংশের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, একসময় বেঁচে ফেরার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন।
তার কথায়, তিনি নিজেকে মৃত বলেই ধরে নিয়েছিলেন। মনে করেছিলেন, আর কোনো আশা নেই।
তবে ড্রোনে ঝুলে নিরাপদ স্থানে পৌঁছানোর সময়ও ভয় ছিল তার। পড়ে যাওয়ার চেয়ে পানিতে পড়ার আশঙ্কা তাকে বেশি আতঙ্কিত করেছিল। কারণ, তিনি সাঁতার জানেন না।
ভ্লাসেনকোর এই উদ্ধার অভিযান ইউক্রেন যুদ্ধের নতুন বাস্তবতাও তুলে ধরেছে। সম্মুখসারিতে ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে আহত সেনাদের উদ্ধার করাও প্রাণঘাতী ঝুঁকির কাজ হয়ে উঠেছে।
রাশিয়া ও ইউক্রেন—দুই পক্ষের সেনারাই অনেক সময় মাটির গভীরে খনন করা আশ্রয়ে মাসের পর মাস আটকে থাকেন। আকাশে ড্রোনের নজরদারির কারণে সামান্য চলাচলও তাদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে ভারী মালবাহী ড্রোন ব্যবহার করে একজন সেনাকে উদ্ধার করা আধুনিক যুদ্ধের নতুন এক দিক সামনে এনেছে।
সূত্র: রয়টার্স

