অর্থনৈতিক চাপে ধুঁকছে এসএমই উদ্যোক্তারা
ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ স্টলজুড়ে সাজানো রঙিন পোশাক, হস্তশিল্প, খাবার ও নতুন পণ্যের সম্ভার। দর্শনার্থীর ভিড়ও কম নয়। তবু বিক্রেতাদের মুখে হাসি নেই। ঢাকার আগারগাঁওয়ে চলমান জাতীয় এসএমই পণ্য মেলায় এসে এমন বৈপরীত্যই চোখে পড়ছে। উদ্যোক্তাদের ভাষায় ‘মেলা চলছে, কিন্তু বাজার চলছে না।’ এসএমই ফাউন্ডেশনের আয়োজনে গত ৭ ডিসেম্বর ঢাকার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে শুরু হওয়া এই মেলা চলবে ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত। অর্থাৎ কাল রবিবারই শেষ হচ্ছে এবারের মেলা। এতে অংশ নিয়েছে ৩৫০টির বেশি এসএমই প্রতিষ্ঠান, যার প্রায় ৬০ শতাংশ নারী উদ্যোক্তার।
অর্থনৈতিক চাপ, বাজারের অনিশ্চয়তা ও তীব্র অর্থায়ন সংকটে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাত কার্যত অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নেমেছে। মেলায় অংশ নেওয়া প্রায় অর্ধশত উদ্যোক্তার সঙ্গে কথা হয় জনকণ্ঠের প্রতিনিধির সঙ্গে, প্রায় সকল উদ্যোক্তরা অর্থনৈতিক চাপ ও বাজারের অস্থিরতা নিয়ে প্রায় সবাই একই সুরে কথা বলছেন। তাদের অনেকেই বলছেন, ২০২৫ সাল নিয়ে বড় কোনো প্রত্যাশা নেই; বরং ২০২৬ সালকে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাব্য সময় হিসেবে দেখছেন। প্রকৃতি হ্যান্ডিক্রাফটের স্বত্বাধিকারী লিপি আক্তার জনকণ্ঠকে বলেন, ‘আমার বিক্রি অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। মানুষ নিজের খরচই কমাচ্ছে। আয় বাড়েনি, কিন্তু জীবনযাত্রার খরচ অনেক বেড়েছে।’ তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে উচ্চবিত্ত এক শ্রেণির ক্রেতা দেশ ছেড়ে চলে গেছেন, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে দামি ও শৌখিন পণ্যের বাজারে।
ব্যবসায় টিকে থাকার আরেক বড় চ্যালেঞ্জ অর্থায়ন। লিপি আক্তার জানান, এর আগে তিনি ব্যাংকের ১০ লাখ টাকার ঋণ পরিশোধ করেছেন। বর্তমানে ব্যবসা বাঁচাতে ১৫ লাখ টাকার ঋণের আবেদন করলেও কয়েক মাস ঘুরেও তা পাননি। বাহারি রং-এর স্বত্বাধিকারী ইলোরা পারভীন জনকণ্ঠকে বলেন, ‘পরিচিত অনেক উদ্যোক্তাই ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেছেন। কেউ কেউ অনলাইনে কোনো রকমে টিকে আছেন। মেলায় এসেও বিক্রি হচ্ছে না।’
চট্টগ্রাম থেকে আসা ইজিস শিল্ড-এর স্বত্বাধিকারী শাহিনা আক্তার বলেন, ‘মানুষের হাতে টাকা আছে, কিন্তু বাজারে ছাড়ছে না। রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে হয়ত ব্যবসা ঘুরে দাঁড়াবে।’ ডিজাইন বাই রুবিনার স্বত্বাধিকারী রুবিনা আক্তার মুন্নি বলেন, ব্যবসা পরিচালনায় ভ্যাট, কমপ্লায়েন্স ও ট্রেড লাইসেন্স-সংক্রান্ত জটিলতা এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য বড় বাধা। ‘তিনি বলেন, গাজীপুরে ফ্যাক্টরি সরানোর পর ট্রেড লাইসেন্স পেতে দুই মাস দৌঁড়াতে হয়েছে। যারা এই লাইসেন্স দেন, তারা এসএমই বাস্তবতা বোঝেন না। আফসানা আহমেদ নামের এক উদ্যোক্তার অভিযোগ, দেশের এসএমই ইকোসিস্টেম প্রায় পুরোপুরি ঢাকাকেন্দ্রিক। ফলে রাজধানীর বাইরে থাকা উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, কাঁচামাল সংগ্রহ কিংবা দাপ্তরিক কাজে অযথা সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়।
নারী উদ্যোক্তারা বলছেন, ব্যবসায়িক সংকটের পাশাপাশি সামাজিক ও পারিবারিক বাধাও তাদের এগিয়ে চলাকে কঠিন করে তুলছে। প্রিমিয়াম চা নিয়ে কাজ করা উদ্যোক্তা জান্নাতুল মাওয়া বলেন, ‘মূলধন সংকট, লাইসেন্স জটিলতা আর পারিবারিক সমর্থনের অভাব, সব মিলিয়ে নারী উদ্যোক্তাদের পথটা আরও কঠিন।’ এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী জনকণ্ঠকে বলেন, তৃণমূল ও নারী উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ডকুমেন্টেশন সমস্যা, দক্ষতার ঘাটতি আর ব্যাংকারদের অনীহার কারণে প্রকৃত প্রান্তিক উদ্যোক্তারা প্রায়ই ঋণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৪ অনুযায়ী, জাতীয় জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় কম।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, নীতিগত সহায়তা ও সহজ অর্থায়ন ছাড়া এই খাত ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন। তবু উদ্যোক্তারা পুরোপুরি আশাহীন নন। তাদের অনেকের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে ২০২৬ সাল থেকে এসএমই খাত নতুন করে গতি পেতে পারে।

