দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সংগতি রেখে বেতন বাড়ানোর দাবিতে দেশজুড়ে আন্দোলনে নেমেছেন তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকরা। মাসিক ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরি নির্ধারণ, নতুন মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে বেতন কাঠামো পুনর্নির্ধারণ এবং চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের পুনর্বহালের দাবিতে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ ও কর্মবিরতি চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় নারায়ণগঞ্জে শ্রমিক আন্দোলন আরও জোরালো হয়ে উঠেছে। বেতন বৃদ্ধির দাবিতে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড অবরোধ করে রেখেছেন আন্দোলনরত শ্রমিকরা। এতে ওই সড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে।
সর্বশেষ গত রোববার (১ নভেম্বর) রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়াসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের আন্দোলনে পোশাক কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) জানিয়েছে, ওই দিন দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের ৫২৯টি কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়। এতে প্রায় ৯ লাখ ৮৭ হাজার শ্রমিক কর্মস্থল ছেড়ে বেরিয়ে যান। তবে বিজিএমইএর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জের ১৯৭টি কারখানায় সেদিন এ ধরনের উৎপাদন বিঘ্নের ঘটনা ঘটেনি।
শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের মুখে গত ১ নভেম্বর ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। এর আগে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছিলেন, নতুন মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। শ্রমিকদের দাবি, মাসিক ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা করতে হবে।
এদিকে নারায়ণগঞ্জেও নতুন মজুরি কাঠামোর দাবিতে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করে আসছেন শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা। গত ১৬ অক্টোবর বিকেলে নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গার্মেন্টস শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (জি-স্কপ) জেলা শাখার উদ্যোগে সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশ থেকে অবিলম্বে গার্মেন্টস খাতের জন্য নতুন মজুরি বোর্ড গঠন, জাতীয় পে-স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি নির্ধারণ এবং ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর করার দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি শ্রমিক ছাঁটাই, নির্যাতন ও দমন-পীড়ন বন্ধ এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো চালুর দাবিও তোলা হয়।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি সেলিম মাহমুদ। সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের নারায়ণগঞ্জ জেলা সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতাদের মতে, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে প্রচলিত মজুরিতে শ্রমিকদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বাড়িভাড়া, খাদ্যপণ্য, চিকিৎসা ও সন্তানদের শিক্ষার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শ্রমিকদের জীবনযাত্রায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় নতুন মজুরি কাঠামো দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, রূপগঞ্জ ও বন্দরসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য পোশাক কারখানা। এসব কারখানায় কর্মরত বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের জীবন-জীবিকা পোশাকশিল্পের ওপর নির্ভরশীল। ফলে জাতীয় পর্যায়ে নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণের উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন স্থানীয় শ্রমিক সংগঠনের নেতারা।
অন্যদিকে বেতন বৃদ্ধির দাবির পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জে বন্ধ কারখানা চালু ও বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবিতেও শ্রমিকদের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। গত ২৫ অক্টোবর রিচ প্লাস নিটওয়্যার কারখানা চালু এবং সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের বকেয়া বেতনসহ আইনানুগ পাওনা পরিশোধের দাবিতে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করেন ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকরা।
সব মিলিয়ে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের পর শ্রমিকদের প্রত্যাশা, দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে ন্যূনতম বেতন নির্ধারণ করে তা কার্যকর করা হবে। একই সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের শ্রমিক সংগঠনগুলোও নতুন মজুরি কাঠামো, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা এবং শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিতের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা বলছে।

