একসময় নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি আবর্তিত হতো আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে কেন্দ্র করে। ক্ষমতার পালাবদল, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অনুপস্থিতি এবং ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সেই চেনা রাজনৈতিক দৃশ্যপট অনেকটাই বদলে গেছে। এখন জেলার রাজনীতিতে বিএনপির পাশাপাশি শক্ত অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। জাতীয় নির্বাচনে পাঁচটি সংসদীয় আসনের চারটিতে বিএনপির জয় এবং একটি আসনে এনসিপির বিজয় নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের সূচনা করেছে।
তবে সংসদ নির্বাচনের ফলাফলই যে আগামী দিনের রাজনৈতিক শক্তির চূড়ান্ত হিসাব, তা মনে করছেন না রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। বরং ইউনিয়ন পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে তিন রাজনৈতিক শক্তির সাংগঠনিক অবস্থান, প্রার্থী বাছাই, স্থানীয় নেতৃত্বের প্রভাব এবং ভোটারদের আস্থা অর্জনের প্রতিযোগিতাই এখন বড় হয়ে উঠছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু, নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে নজরুল ইসলাম আজাদ, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে আজহারুল ইসলাম মান্নান এবং নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে আবুল কালাম বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়েছেন।
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন ১ লাখ ৬ হাজার ১৭১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মনির হোসাইন পান ৮০ হাজার ৬১৯ ভোট।
বিশেষ করে ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে এনসিপির এই জয় স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির সাংগঠনিক প্রভাব থাকা এ এলাকায় এখন সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব করছেন নতুন রাজনৈতিক দলের একজন নেতা।
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নানের সঙ্গে জামায়াতের প্রার্থী ইকবাল হোসাইন ভূঁইয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতাও ছিল উল্লেখযোগ্য। মান্নান ১ লাখ ৫৫ হাজার ৪০০ ভোট এবং ইকবাল ১ লাখ ৩৪ হাজার ৯১৮ ভোট পান। অর্থাৎ বিএনপির জয় হলেও জামায়াতের ভোটের অবস্থান দলটির সাংগঠনিক শক্তির একটি ইঙ্গিত দিয়েছে।
জাতীয় নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনী সমীকরণে অংশ নিলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তির ওপর নির্ভর করতে চাইছে।
দলটির নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। মেয়র পদে মহানগর জামায়াতের আমির মাওলানা আবদুল জব্বারকে প্রার্থী হিসেবে সামনে আনা হয়েছে। পাশাপাশি অন্তত ১৫টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী চূড়ান্ত করার কথাও দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এমনকি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও একক প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। জামায়াতের নেতারা মনে করছেন, সংসদ নির্বাচনে জোটগত সমন্বয় থাকলেও স্থানীয় নির্বাচনে নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা যাচাই করার সুযোগ রয়েছে।
এখানেই বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে নতুন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। কারণ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতাসীন দল হিসেবে চারটি আসন পেলেও স্থানীয় পর্যায়ে জামায়াত নিজেদের ভোটের ভিত্তি ও সাংগঠনিক শক্তি কাজে লাগাতে চাইছে।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিজয়ের পর এনসিপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সংসদীয় সাফল্যকে সাংগঠনিক শক্তিতে রূপান্তর করা।
গত ১৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। মহানগর কমিটির আহ্বায়ক করা হয় মো. শওকত আলীকে এবং সদস্য সচিব করা হয় আশিকুর রহমান অভিকে। জেলা কমিটির আহ্বায়ক যুবাইর আহমেদ সরদার ও সদস্য সচিব জোবায়ের হোসেন তামজিদ।
এরপর ৪ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে জেলা এনসিপি নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করে। নিরব রায়হানকে চেয়ারম্যান এবং মো. ইউসুফ হোসাইনকে সেক্রেটারি করে গঠিত এই কমিটির দায়িত্ব মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি, সমন্বয়, প্রচারণা ও নির্বাচনী পরিকল্পনা তৈরি করা।
অর্থাৎ সংসদ সদস্য পাওয়ার পর এনসিপি এখন শুধু ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জের সংসদীয় আসনকেন্দ্রিক রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না। জেলার অন্যান্য এলাকাতেও নিজেদের সাংগঠনিক পরিচিতি বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
তবে নতুন দল হিসেবে তাদের সামনে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশেষ করে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে স্থায়ী কমিটি, পরিচিত নেতৃত্ব এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো গ্রহণযোগ্য প্রার্থী তৈরি করতে হবে।
বিএনপি ও এনসিপির মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্বের বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে ফতুল্লার বক্তাবলীতে এনসিপির নেতা তাওহীদুল ইসলামের ওপর হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর বক্তাবলী বাজার এলাকায় হামলার ঘটনায় বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। পরদিন এ ঘটনায় হত্যাচেষ্টার মামলা করা হয়। মামলায় বিএনপির ১৬ নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
ঘটনাটি স্থানীয় রাজনীতিতে দুই দলের সম্পর্ক নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করে। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনে জোটগত সমীকরণের অংশ থাকা রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে এমন বিরোধ ভবিষ্যৎ নির্বাচনী সমঝোতাকে কতটা প্রভাবিত করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
তবে অভিযোগ ও মামলার বিষয়টি বিচারাধীন আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ। তদন্ত ও আদালতের সিদ্ধান্তের আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের মধ্যে চেয়ারম্যান প্রার্থী হওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।
অনেক ইউনিয়নে বিএনপির সমর্থন প্রত্যাশী ছয় থেকে সাতজন প্রার্থী রয়েছেন। আড়াইহাজারের কোনো কোনো ইউনিয়নে এই সংখ্যা ১৬ থেকে ১৭ জন পর্যন্ত। রূপগঞ্জের সাতটি ইউনিয়নে প্রতিটিতে সাত থেকে আটজন সম্ভাব্য প্রার্থী রয়েছেন। সোনারগাঁয়ের ১০টি ইউনিয়ন ঘিরে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন প্রার্থী প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এতে বিএনপির জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে বড় জয় পাওয়ার পর দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ বেড়েছে। কিন্তু একই ইউনিয়নে একাধিক নেতা চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইলে দলীয় কোন্দল ও বিভক্তির আশঙ্কাও রয়েছে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী অনেক ইউনিয়নে একক প্রার্থী প্রস্তুত রাখার দাবি করছে। ফলে বিএনপির অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতার বিপরীতে জামায়াত যদি একক প্রার্থী নিয়ে মাঠে নামতে পারে, তাহলে কিছু ইউনিয়নে তারা বাড়তি সুবিধা পেতে পারে।
এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও যোগ্য প্রার্থী খুঁজছে। ফলে স্থানীয় নির্বাচন শুধু বিএনপি-জামায়াতের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা নেই।
ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির ভেতরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যদের পছন্দের প্রার্থী কারা হবেন, সেটি নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের পাঁচ উপজেলায় মোট ৩৯টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। এসব ইউনিয়নে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের একাধিক নেতা প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। স্থানীয় পর্যায়ে সংসদ সদস্যদের ঘনিষ্ঠ নেতাদের প্রার্থিতার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
এক্ষেত্রে রূপগঞ্জে মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু, আড়াইহাজারে নজরুল ইসলাম আজাদ, সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় আজহারুল ইসলাম মান্নান এবং সদর-বন্দর এলাকায় আবুল কালামের রাজনৈতিক প্রভাব স্থানীয় প্রার্থী বাছাইয়ে কতটা ভূমিকা রাখবে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে দলীয় প্রতীক বা আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন না থাকলে স্থানীয় জনপ্রিয়তা, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও ভোটের মাঠের অবস্থানও বড় নিয়ামক হতে পারে। সংসদ সদস্যদের পছন্দের বাইরে গিয়ে কেউ স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করলে বিএনপির ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ায় দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ভারসাম্যেও পরিবর্তন এসেছে। একসময় আওয়ামী লীগের শক্তিশালী সাংগঠনিক অবস্থান ছিল এমন অনেক এলাকায় এখন বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির নেতাকর্মীরা নিজেদের অবস্থান বিস্তারের চেষ্টা করছেন।
তবে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অনুপস্থিতি মানেই তাদের সাবেক ভোটার ও সমর্থকদের সবাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো একটি দলের দিকে চলে গেছেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। স্থানীয় নেতৃত্ব, প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এবং এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ওপরও ভোটের হিসাব নির্ভর করবে।
বিশেষ করে রূপগঞ্জ, আড়াইহাজার, সোনারগাঁ, ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ ও বন্দরের ইউনিয়নগুলোতে আগামী দিনে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে এখন তিনটি শক্তির তিন ধরনের লক্ষ্য দেখা যাচ্ছে। বিএনপি জাতীয় নির্বাচনের চারটি আসনে জয়কে কাজে লাগিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক আধিপত্য ধরে রাখতে চায়। জামায়াতে ইসলামী স্থানীয় নির্বাচনে এককভাবে অংশ নিয়ে নিজেদের ভোটের শক্তি যাচাই করতে আগ্রহী। আর এনসিপি সংসদীয় প্রতিনিধিত্বকে ভিত্তি করে নতুন সংগঠন বিস্তারের চেষ্টা করছে।
তবে এই তিন দলের মধ্যে প্রতিযোগিতার ধরন এক নয়। বিএনপির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি ও প্রার্থী বাছাইয়ের বিরোধ সামাল দেওয়া। জামায়াতের সামনে রয়েছে সংসদ নির্বাচনের ভোটকে স্থানীয় নির্বাচনে ধরে রাখার পরীক্ষা। অন্যদিকে এনসিপিকে প্রমাণ করতে হবে, একটি সংসদীয় আসনে জয় তাদের সাময়িক নির্বাচনী সাফল্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অবস্থানের ভিত্তি।
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে এখন তাই প্রশ্ন শুধু কে কয়টি সংসদীয় আসন পেয়েছে, তা নয়। বরং কে তৃণমূলের সংগঠন ধরে রাখতে পারছে, কে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করতে পারছে এবং কে স্থানীয় নির্বাচনে ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে পারছে সেটিই হয়ে উঠছে বড় হিসাব।
জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির চার আসনের জয় দলটিকে এগিয়ে রাখলেও ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জে এনসিপির বিজয় এবং বিভিন্ন এলাকায় জামায়াতের সাংগঠনিক তৎপরতা পুরোনো রাজনৈতিক হিসাবকে বদলে দিয়েছে। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন এই নতুন সমীকরণের প্রথম বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক মাঠে তাই এখন একটাই প্রশ্ন বিএনপি কি নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে পারবে, নাকি জামায়াত ও এনসিপি সেই জায়গায় ভাগ বসিয়ে নতুন রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য তৈরি করবে?

