নারায়ণগঞ্জের আইনজীবী অঙ্গনে রাজনৈতিক বিরোধ, নেতৃত্বের টানাপোড়েন ও পারস্পরিক দূরত্ব নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পেশাগত সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিরোধ যখন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, তখন তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট নেতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, আইনজীবীদের ঐক্য, সংগঠনের কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন দেখা দেয়।
নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতিকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক বিরোধের প্রেক্ষাপটে সামনে এসেছে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান এবং জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এইচ এম আনোয়ার প্রধানের মধ্যকার দূরত্ব। একসময় ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে আইনজীবী অঙ্গনে তাঁদের গুরু-শিষ্য হিসেবে পরিচিতি ছিল। এখন সেই সম্পর্কের জায়গায় তৈরি হয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ।
জেলা আইনজীবী সমিতির আসন্ন নির্বাচনে সভাপতি পদে কে প্রার্থী হবেন, তা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। আনোয়ার প্রধান সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী অন্যদিকে সাখাওয়াত হোসেন খান ও তাঁর ঘনিষ্ঠ আইনজীবীদের একটি অংশ জাকির হোসেনকে সভাপতি পদে প্রার্থী করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন ।
আনোয়ার প্রধান এর আগে দুইবার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে সাখাওয়াত হোসেন খান আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দুই পদেই দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে এই বিরোধের সঙ্গে শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়, সংগঠনের নেতৃত্বে কার অবস্থান কতটা শক্তিশালী থাকবে, সেই প্রশ্নও যুক্ত হয়েছে।
দুই পক্ষের দূরত্ব বাড়ার আরেকটি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিশেষ সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) নিয়োগের বিষয়টি।
গত ২৫ আগস্ট আইনজীবী সুমন মিয়াকে ওই ট্রাইব্যুনালের বিশেষ পিপি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু তাঁর দায়িত্ব পালন ও নির্ধারিত চেম্বারে বসা নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়।
আনোয়ার প্রধানের বলেন, সুমন মিয়া আইনজীবী সমিতির সদস্য নন, তাই তাঁকে ওই পদে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে তাঁদের আপত্তি রয়েছে। অন্যদিকে সুমন মিয়া ও তাঁর নিয়োগের পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের বক্তব্য, সরকারি নিয়োগের পর তাঁকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া উচিত।
এখানে মূল বিরোধটি শুধু একজন পিপির নিয়োগ নিয়ে নয়, বরং নিয়োগের গ্রহণযোগ্যতা, আইনজীবীদের প্রতিনিধিত্ব এবং পেশাগত সংগঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার কতটা ভূমিকা থাকবে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের কার্যক্রম স্থানান্তরের বিষয়টি নিয়েও আইনজীবীদের মধ্যে মতপার্থক্যের রয়েছে । আনোয়ার প্রধানের অনুসারী আইনজীবীদের একটি অংশ চান, আদালতের কার্যক্রম চানমারী এলাকা থেকে স্থানান্তর করা না হোক।
আদালতের অবস্থান পরিবর্তনের সঙ্গে আইনজীবীদের চেম্বার, মামলা পরিচালনা, মক্কেলদের যাতায়াত এবং দৈনন্দিন পেশাগত সুবিধার বিষয় যুক্ত। এ কারণে আদালত স্থানান্তরের মতো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও আইনজীবীদের মধ্যে সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক বিতর্কের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
গত ৬ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির ভবনের দ্বিতীয় তলায় দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি, হট্টগোল ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। বিকেল আনুমানিক আড়াইটার দিকে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান এবং জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকিরসহ কয়েকজন আইনজীবীকে ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়।
ওই দিন জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সরকার হুমায়ুন কবিরের চেম্বারে আইনজীবীদের খাবারের আয়োজন ছিল। একই সময়ে আনোয়ার প্রধানের পক্ষের আইনজীবীদেরও পৃথক আয়োজন ছিল। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ে এবং তা হাতাহাতিতে গড়ায়।
ঘটনার দায় নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী। সাখাওয়াত হোসেন খান অভিযোগ করেন, তাঁকে উদ্দেশ করে অশোভন মন্তব্য ও হেনস্তা করা হয়েছে। অন্যদিকে আনোয়ার প্রধান ও পিপি আবুল কালাম আজাদ জাকির দাবি করেন, সাখাওয়াতের অনুসারীরা তাঁদের ওপর হামলা করেছেন। জাকির আহত হওয়ার কথাও জানান।
ঘটনার পর বিষয়টি আইনজীবী সমিতির অভ্যন্তরীণ বিরোধের গণ্ডি ছাড়িয়ে মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক পর্যায়েও পৌঁছে যায়।
৮ অক্টোবর মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপুর স্বাক্ষরিত নোটিশে আনোয়ার প্রধান ও মহানগর বিএনপির ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি শেখ আঞ্জুম আহমেদ রিফাতকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়। নোটিশে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং সাখাওয়াত হোসেন খানের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগ তোলা হয়।
পরবর্তী সময়ে ১১ অক্টোবর সাখাওয়াত হোসেন খান ও আবু আল ইউসুফ খান টিপুর স্বাক্ষরিত চিঠিতে আনোয়ার প্রধান ও রিফাতের দলীয় পদ স্থগিতের কথা প্রকাশিত সংবাদে জানানো হয়। তাঁদের দেওয়া ব্যাখ্যা সন্তোষজনক হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে উল্লেখ করা হয়।
ঘটনার পরদিন দুই পক্ষের আইনজীবীদের পৃথক অবস্থান নেন । সাখাওয়াত-হুমায়ুন পক্ষ এবং আনোয়ার-জাকির পক্ষকে ঘিরে আইনজীবীদের মধ্যে বিভক্তির চিত্র সামনে আসে।
এই পরিস্থিতিতে আইনজীবীদের একটি অংশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বিরোধের কারণে পেশাগত সংগঠনের স্বাভাবিক কার্যক্রম যেন বাধাগ্রস্ত না হয়। আইনজীবী সমিতি কোনো একক নেতা বা গোষ্ঠীর প্রভাবের বাইরে সদস্যদের পেশাগত স্বার্থ, অধিকার ও কল্যাণে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে, সেটিও আলোচনার বিষয়।
আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের আগে এই বিরোধ বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের ভোটের হিসাবেও প্রভাব ফেলতে পারে। একটি অংশের সমর্থন একদিকে এবং অন্য অংশের সমর্থন বিপরীত দিকে থাকলে প্রার্থী বাছাই, প্যানেল গঠন ও নির্বাচনী প্রচারে তার প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে বিভক্তির কারণে কোন পক্ষ সুবিধা পাবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। নির্বাচনে প্রার্থীদের গ্রহণযোগ্যতা, আইনজীবীদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পেশাগত স্বার্থ, সংগঠনের সিদ্ধান্ত এবং শেষ পর্যন্ত ভোটারদের অবস্থানই ফল নির্ধারণ করবে।
নারায়ণগঞ্জের আইনজীবী রাজনীতিতে চলমান বিরোধ এখন কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে। নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ হবে, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের মতামত কতটা গুরুত্ব পাবে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য কীভাবে সামাল দেওয়া হবে এবং পেশাগত সংগঠনের ঐক্য কীভাবে বজায় থাকবে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।
সাখাওয়াত হোসেন খান ও আনোয়ার প্রধানের বিরোধের নিষ্পত্তি কেবল দুই নেতার সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আইনজীবী সমিতির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের সাংগঠনিক ঐক্য এবং আদালতপাড়ার পেশাগত পরিবেশ।
অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের পরিবর্তে নিরপেক্ষ পর্যালোচনা, আলোচনার সুযোগ এবং সংগঠনের বিধি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্য দিয়ে এই বিরোধের সমাধান সম্ভব কি না, সেটিই এখন নারায়ণগঞ্জের আইনজীবী অঙ্গনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

