আজ শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬। হিজরি পঞ্জিকা অনুযায়ী আজ ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজর। মুসলিম উম্মাহর কাছে শুক্রবার বা জুমার দিনটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও বরকতময় একটি দিন। মহান আল্লাহ এই দিনকে মুসলমানদের সাপ্তাহিক ইবাদত ও সমবেত হওয়ার বিশেষ দিন হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।
পবিত্র কোরআনে জুমার নামাজের গুরুত্ব স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সূরা আল-জুমুআর ৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, জুমার দিনে নামাজের জন্য আহ্বান করা হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ছেড়ে আল্লাহর স্মরণের দিকে এগিয়ে যেতে। এটিকে মুমিনদের জন্য কল্যাণকর বলা হয়েছে।
জুমার দিন কেন এত মর্যাদাপূর্ণ?
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “সূর্য উদিত হওয়ার দিনগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম দিন হলো শুক্রবার।” সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, এই দিনে হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়, তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয় এবং পরবর্তীতে সেখান থেকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়। কিয়ামতও শুক্রবার সংঘটিত হবে বলে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ জুমার দিনটি শুধু সাপ্তাহিক ছুটির দিন নয়; বরং একজন মুমিনের জন্য আত্মশুদ্ধি, তওবা, ইবাদত, দোয়া ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের বিশেষ সুযোগ।
জুমার দিনে দোয়া কবুলের বিশেষ সময়
জুমার দিনের অন্যতম বড় ফজিলত হলো—এ দিনে এমন একটি বিশেষ সময় রয়েছে, যখন কোনো মুসলমান আল্লাহর কাছে কল্যাণকর কিছু প্রার্থনা করলে আল্লাহ তাকে তা দান করেন। সহিহ মুসলিমের হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) এ বিশেষ সময়ের কথা উল্লেখ করেছেন।
অন্য একটি হাদিসে জুমার দিনের শেষ সময়ে, বিশেষ করে আসরের পরের সময়ে, দোয়া করার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
তাই জুমার দিন একজন মুমিনের উচিত নিজের জন্য, পরিবার-পরিজনের জন্য, অসহায় ও দরিদ্র মানুষের জন্য এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য বেশি বেশি দোয়া করা।
গরিবের জন্য জুমার দিনের ফজিলত কতটা?
জুমার দিনের ফজিলত শুধু ধনী বা সামর্থ্যবান মানুষের জন্য নয়—গরিব, অসহায়, শ্রমজীবীসহ প্রত্যেক মুসলমানের জন্যই আল্লাহর রহমত ও ইবাদতের সুযোগ উন্মুক্ত।
ইসলামে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য অর্থ-সম্পদকে শর্ত করা হয়নি। একজন দরিদ্র মানুষও নামাজ, দোয়া, জিকির, তওবা, কোরআন তিলাওয়াত ও দরুদ পাঠের মাধ্যমে মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারেন।
বরং জুমার দিনের সৌন্দর্যই হলো—মসজিদে ধনী-গরিব, মালিক-শ্রমিক, ক্ষমতাবান-অসহায় সবাই একই কাতারে দাঁড়িয়ে আল্লাহর সামনে নিজেদের সমর্পণ করেন। মানুষের সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য সেখানে মুখ্য নয়; আল্লাহর কাছে তাকওয়া ও আমলই মূল বিষয়।
জুমার নামাজে আগে যাওয়ার বিশেষ মর্যাদা
জুমার দিনে মসজিদে আগে যাওয়ারও বিশেষ ফজিলত রয়েছে। সহিহ বুখারির হাদিসে এসেছে, জুমার দিন ফেরেশতারা মসজিদের দরজায় অবস্থান করে আগত মুসল্লিদের নাম ক্রমানুসারে লিখতে থাকেন।
যে ব্যক্তি প্রথম দিকে মসজিদে আসে, তার আমলের সঙ্গে উট কোরবানি করার সওয়াবের তুলনা করা হয়েছে; পরবর্তী সময়ে আগতদের জন্য গরু, দুম্বা, মুরগি ও ডিম কোরবানির সমপরিমাণ ফজিলতের কথা হাদিসে এসেছে। ইমাম খুতবার জন্য বের হলে ফেরেশতারা তাদের নথি বন্ধ করে খুতবা শুনতে থাকেন।
জুমার দিনের গুরুত্বপূর্ণ আমল
জুমার দিনে মুসলমানদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল রয়েছে। এর মধ্যে—
১. গোসল করা ও পরিচ্ছন্ন হওয়া:
জুমার দিন গোসল ও পরিচ্ছন্নতার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সহিহ বুখারির হাদিসে জুমার দিনের গোসলের কথা এসেছে।
২. দ্রুত মসজিদের দিকে যাওয়া:
সম্ভব হলে আগে মসজিদে গিয়ে নামাজ ও খুতবার জন্য অপেক্ষা করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।
৩. মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা:
ইমামের খুতবার সময় মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং অনর্থক কথা বলা থেকে বিরত থাকা উচিত। হাদিসে খুতবার সময় ফেরেশতাদেরও মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনার কথা উল্লেখ রয়েছে।
৪. বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা:
জুমার দিনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ ও সালাম পাঠ করা মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত উত্তম আমল।
৫. দোয়া ও তওবা করা:
জুমার দিনের বিশেষ সময়ে দোয়া কবুলের সুসংবাদ থাকায় এ দিনে নিজের ভুলের জন্য তওবা করা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত।
৬. কোরআন তিলাওয়াত ও জিকির করা:
জুমার দিন কোরআন তিলাওয়াত, জিকির ও অন্যান্য নেক আমলের মাধ্যমে দিনটি অতিবাহিত করা একজন মুমিনের জন্য কল্যাণকর।
জুমার নামাজ সম্পর্কে কোরআনের নির্দেশ
মহান আল্লাহ বলেন—
“হে মুমিনগণ! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে দ্রুত অগ্রসর হও এবং বেচাকেনা পরিত্যাগ কর। এটিই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।”
—সূরা আল-জুমুআ, ৬২:৯
এর পরের আয়াতে আল্লাহ নামাজ শেষ হলে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করার এবং বেশি বেশি আল্লাহকে স্মরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
ধনী-গরিব সবার জন্য রহমতের দরজা
জুমার দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষের প্রকৃত মর্যাদা অর্থ-সম্পদে নয়। যে ব্যক্তি দরিদ্র হয়েও আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তার জন্যও রহমত ও ক্ষমার দরজা খোলা রয়েছে।
একজন গরিব মানুষের হয়তো বড় অঙ্কের সদকা করার সামর্থ্য নেই, কিন্তু তার দুই হাত তুলে করা আন্তরিক দোয়া, সিজদায় ঝরানো অশ্রু, তওবা, জিকির এবং আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস—এসবই তার জন্য আল্লাহর নৈকট্যের মাধ্যম হতে পারে।
তাই জুমার দিনকে শুধু ধনী মানুষের জন্য নয়, বরং অসহায়-দরিদ্রসহ প্রত্যেক মুমিনের জন্য আল্লাহর বিশেষ রহমত ও ইবাদতের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।
আজকের দিনে হোক আত্মশুদ্ধির অঙ্গীকার
জুমার এই বরকতময় দিনে মুসলমানদের উচিত পার্থিব ব্যস্ততা থেকে কিছুটা সময় বের করে আল্লাহর স্মরণে মনোনিবেশ করা। নিজের ভুল-ত্রুটির জন্য ক্ষমা চাওয়া, মানুষের প্রতি অন্যায় করে থাকলে তা সংশোধন করা, অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং পরিবার-পরিজনসহ সবার জন্য কল্যাণের দোয়া করা।
পবিত্র জুমার শিক্ষা হোক—আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং অসহায়ের প্রতি সহমর্মিতা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে জুমার দিনের মর্যাদা বোঝার, যথাযথ আমল করার এবং তাঁর রহমত ও ক্ষমা লাভ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

