নারায়ণগঞ্জে বিএনপির সাংগঠনিক পরিস্থিতি নিয়ে দিন দিন উদ্বেগ বাড়ছে। দীর্ঘদিনের ত্যাগ-তিতিক্ষার পর দলটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে এলেও জেলার বিভিন্ন পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং শৃঙ্খলার ঘাটতি এখন প্রকাশ্য আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কার্যকর চেইন অব কমান্ডের অভাবে দলীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সমন্বয়ের সংকট তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই যে যার মতো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করায় সংগঠনের ভেতরে সবাই নিজেকে নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। ফলে প্রশ্ন উঠছে তাহলে মাঠপর্যায়ের কর্মীরা কোথায়?
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণআন্দোলন এবং পরবর্তী গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম মূল প্রতিপাদ্য ছিল বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠন, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের অবসান এবং দলীয়করণের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা। সাধারণ মানুষও সেই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নারায়ণগঞ্জে ঘটে যাওয়া কয়েকটি আলোচিত ঘটনা সেই প্রত্যাশাকে অনেকটাই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।
বিশেষ করে ৫ ও ৬ আগস্টের মধ্যে বন্দর উপজেলার প্রায় ১৮টি বাড়িতে ডাকাতি, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও হামলার ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। একই সময় শহর ও বন্দরের বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও লুটপাটের অভিযোগ ওঠে। পরবর্তী কয়েক মাসে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাই, দখল, চাঁদাবাজি ও প্রভাব বিস্তারের ঘটনাও আলোচনায় আসে। স্থানীয়দের দাবি, এসবের অনেক ঘটনাই প্রকাশ্যেই সংঘটিত হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছে।
বিভিন্ন ঘটনার অভিযোগে বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর নাম সামনে এলেও অনেক ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে সুবিধাবাদী ও অপরাধী চক্রও সক্রিয় ছিল বলে স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব অপকর্মে প্রকৃত দলীয় কর্মী, সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি এবং পূর্বের রাজনৈতিক পরিচয় বদলে নতুন পরিচয়ে সক্রিয় হওয়া কিছু গোষ্ঠী সব মিলিয়ে একটি জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রকাশ্য ডাকাতি বা লুটপাটের ঘটনা তুলনামূলক কমলেও চাঁদাবাজি, দখল বাণিজ্য, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন খাতে দলীয় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ এখনও পুরোপুরি থামেনি বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। একই সঙ্গে বিএনপির নাম ব্যবহার করে মাদক ব্যবসা, ভূমি দখল, জবরদখল ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধ সংঘটনের অভিযোগও উঠে এসেছে।
বন্দর এলাকার একাধিক লুটপাট, শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে মালামাল সরিয়ে নেওয়া, কর্ণফুলি ডকইয়ার্ডে জাহাজ কেটে বিক্রির অভিযোগ, নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে হামলা, বিভিন্ন ফেরিঘাট, বাস টার্মিনাল, অবৈধ স্ট্যান্ড ও হকার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজির অভিযোগ এসব ঘটনাতেও বিভিন্ন সময়ে বিএনপির নামধারী কিছু নেতাকর্মীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে স্থানীয় সুবিধাবাদী চক্র এবং রাজনৈতিক পরিচয় বদলানো কিছু ব্যক্তিও এসব কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া শহরের হকার উচ্ছেদ ইস্যুতেও দলটির ভেতরে মতবিরোধ দৃশ্যমান হয়েছে। একপক্ষ উচ্ছেদের পক্ষে অবস্থান নিলেও আরেক পক্ষ আড়াল থেকে অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে—এমন অভিযোগও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত।
এর আগে ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি ‘রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতে ৩১ দফা ও জনসম্পৃক্তি’ শীর্ষক কর্মশালায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, বর্তমান চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নেতাকর্মীদের জনগণের আস্থা অর্জন, নিজেদের ভুল-ত্রুটি শুধরে নেওয়া এবং দলবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, বিএনপির বিরুদ্ধে নানা ধরনের অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র চললেও জনগণের আস্থা ধরে রাখতে হলে নেতাকর্মীদের দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর জনগণ একটি সুশাসনভিত্তিক প্রশাসন প্রত্যাশা করছে। সেই বাস্তবতায় যদি দলীয় পরিচয়ে অপরাধ, দখল, চাঁদাবাজি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ অব্যাহত থাকে, তাহলে সরকারের পাশাপাশি দল হিসেবেও বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সচেতন মহলের মতে, নারায়ণগঞ্জ বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সংগঠনের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করা এবং সুবিধাবাদী ও অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদের দল থেকে বিচ্ছিন্ন করা। একই সঙ্গে অতীতে আলোচিত লুটপাট, দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা এবং নিরপরাধ কাউকে যেন হয়রানির শিকার হতে না হয়, সে বিষয়েও দল ও সরকারের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এমন পদক্ষেপই নারায়ণগঞ্জে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি ও জনআস্থা পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

