কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে যখন দেশের বিভিন্ন স্থানে দলটির নেতাকর্মীদের সরব কিংবা গোপন তৎপরতা নিয়ে আলোচনা চলছিল, তখন নারায়ণগঞ্জে অনেকটাই নীরব ছিলেন মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও সাবেক সিটি মেয়র সেলিনা হায়াত আইভী। একসময় দলের পক্ষে প্রকাশ্যে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া এই নেত্রীর সাম্প্রতিক নীরবতা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে নারায়ণগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি থাকলেও আইভীর পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য, কর্মসূচি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলীয় শুভেচ্ছা বার্তা দেখা যায়নি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, কারামুক্তির পর আইভীর রাজনৈতিক ভাষা ও অবস্থানে একটি দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে।
২০২৫ সালের ৯ মে গ্রেপ্তারের সময়ও আইভী প্রকাশ্যে “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু” স্লোগান দিয়ে নিজেকে আওয়ামী লীগের আদর্শের অনুসারী হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি তখন অভিযোগ করেছিলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততা যদি অপরাধ হয়, তবে সেই দায় তিনি স্বীকার করেন।
সেই সময় তার বাসভবন ‘চুনকা কুটির’-এর সামনে হাজারো সমর্থকের অবস্থান এবং গ্রেপ্তার ঠেকানোর চেষ্টা আইভীর রাজনৈতিক জনপ্রিয়তারও প্রমাণ দেয়।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া একাধিক হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তারের পর প্রায় এক বছরের বেশি সময় কারাগারে ছিলেন আইভী। চলতি জুন মাসে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তার বক্তব্যে আগের মতো দলীয় আবেগের পরিবর্তে সংযত ও সমঝোতামূলক সুর লক্ষ্য করা যায়।
কারামুক্তির পর সাংবাদিকদের সামনে তিনি বিচার বিভাগের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান এবং “সকলকে নিয়ে একটি মানবিক সরকার” গঠনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। উল্লেখযোগ্যভাবে, ওই বক্তব্যে আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু বা দলীয় রাজনীতি নিয়ে কোনো উচ্চকিত মন্তব্য করেননি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় আইভী হয়তো সংঘাতমুখী রাজনীতির পরিবর্তে নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও জনভিত্তি ধরে রাখার কৌশল গ্রহণ করেছেন। কারণ নারায়ণগঞ্জে তিনি বরাবরই দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি একজন জনপ্রিয় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।
বিশেষ করে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে ওসমান পরিবার ও আইভী বলয়ের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের কারণে তিনি বহুবার দলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছেন। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে তিনি নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচিতি গড়ে তোলেন।
সেলিনা হায়াত আইভী নারায়ণগঞ্জের প্রয়াত জনপ্রিয় নেতা আলী আহমদ চুনকার কন্যা। ২০০৩ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়। পরে ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমানকে পরাজিত করে মেয়র হন। এরপর টানা তিনবার মেয়র নির্বাচিত হয়ে দেশের অন্যতম আলোচিত নারী জনপ্রতিনিধিতে পরিণত হন।
আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তার নীরবতা অনেকের কাছে কৌশলগত রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। একসময় দলের অন্যতম উচ্চকণ্ঠ নেত্রী হলেও বর্তমানে তিনি প্রকাশ্যে কোনো দলীয় অবস্থান না নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে আইভীর ঘনিষ্ঠদের দাবি, তিনি এখনো তার রাজনৈতিক আদর্শ থেকে সরে আসেননি; বরং দীর্ঘ কারাবাস ও পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছেন।
সব মিলিয়ে, আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সেলিনা হায়াত আইভীর নীরবতা নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—এটি কি সাময়িক কৌশল, নাকি তার রাজনৈতিক অবস্থানের দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের ইঙ্গিত?

