জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের উপ-নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পেতে আবেদনের সময় তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মতো সাজতে চেষ্টা করেননি বলে জানিয়েছেন রাজনৈতিক প্রশিক্ষক ও মডেল মেঘনা আলম। তিনি জানান, তিনি শুধু প্রধানমন্ত্রী ও মনোনয়ন কমিটির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে মার্জিতভাবে যেতে চেয়েছিলেন।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দিবাগত রাতে নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে মেঘনা আলম এ তথ্য জানান।
পোস্টে রাজনৈতিক প্রশিক্ষক মেঘনা আলম লেখেন, আমি আসলে বেগম খালেদা জিয়ার মতো সাজতে চেষ্টা করিনি। এই একই সাদা শাড়ি ও সাদা ওড়না আমি দুই দিন আগেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পরেছি, আপনারা দেখেছেন। আমি শুধু মার্জিতভাবে যেতে চেয়েছি, প্রধানমন্ত্রী ও মনোনয়ন কমিটির প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা রেখে।
তিনি ওই পোস্টে লেখেন, এত মানুষের ভিড়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে ভেবেই চুলে খোঁপা করে গিয়েছিলাম, যেন গরমে কিছুটা স্বস্তি পাই। গতবার এত প্রার্থীর ভিড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে গিয়ে চুল খোলা থাকায় ঘেমে আমার অবস্থা বেশ খারাপ হয়ে গিয়েছিল।
আমি একদমই মেকআপ করতে পারি না উল্লেখ করে মেঘনা আলম লেখেন, বেশিরভাগ সময় আপনারা আমার স্বাভাবিক চেহারাই দেখতে অভ্যস্ত। তবে ইন্টারভিউতে একটু ফর্মাল লুকের জন্য পরিচিত এক ছোট বোনকে সাজিয়ে দিতে বলেছিলাম। সাজ কেমন হবে জানতে চাইলে আমার গায়ের রঙের সঙ্গে মানানসই লুক বোঝাতে পাকিস্তানের মরিয়ম নওয়াজ ও ক্রিকেটার ইরফান পাঠানের স্ত্রীর ছবি দেখিয়েছিলাম। ভ্রু যেন ঐশ্বরিয়ার মতো স্বাভাবিক রাখে, সেটাও বলেছিলাম। আর চুল বেঁধে দিতে বলেছিলাম এয়ার হোস্টেসদের মতো পরিপাটি করে।
তিনি আরও লেখেন, সবকিছু মিলিয়ে যে আমাকে অবিকল বেগম খালেদা জিয়ার মতো দেখাবে, তা অন্যদের প্রতিক্রিয়া দেখার আগে সত্যিই বুঝতে পারিনি! তবে, জনগণের এমন প্রতিক্রিয়ায় আমি ভীষণ সম্মানিত ও আবেগাপ্লুত। বাংলাদেশের মানুষের কাছে বেগম খালেদা জিয়া যে কতটা শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার নাম, তা আমি জানি। তার সঙ্গে আমার জীবনে একবার দেখা হয়েছিল একটি হাসপাতালে। সেদিন আমার বড় ফুপি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। আজ ফুপিও আর আমাদের মাঝে নেই, তিনিও পরপারে চলে গেছেন। আরেকবার বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত আর দেখা হয়নি। ছোটবেলায় সেই সুযোগ না পাওয়ার কষ্টে আমি খুব কেঁদেছিলাম।
মেঘনা আলম তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, আমার ইরানি বংশোদ্ভূত দাদির মুখের গড়ন ও গায়ের রঙের সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়ার অদ্ভুত মিল আমি প্রায়ই অনুভব করতাম। হয়তো সেই কারণেও তার চেহারার সঙ্গে এই সাদৃশ্য আমার কাছে আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়। বেগম খালেদা জিয়া, আমার দাদি ও আমার ফুপি, তিনজনকেই আল্লাহ জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।
এই রাজনৈতিক প্রশিক্ষক লেখেন, প্রধানমন্ত্রী ও মনোনয়ন কমিটির সঙ্গে কথা বলার যে দুই মিনিট সময় পেয়েছি, সেই সময়ে আমি বলেছি, দলের ত্যাগী কর্মীদের মূল্যায়নের অনেক পথ রয়েছে। কিন্তু জাতীয় সংসদে এমন মানুষেরও প্রয়োজন, যিনি গভর্ন্যান্স, আইন ও নীতিনির্ধারণ, কূটনৈতিক আলোচনা ও সমঝোতা এবং জলবায়ু ও জেন্ডার-সংবেদনশীল অ্যাডভোকেসি সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান ও দক্ষতা রাখেন। সংসদ সদস্যপদ কেবল দলীয় আনুগত্যের প্রতিদান হিসেবে দেওয়ার মতো কোনো উপহার নয়। মহান জাতীয় সংসদ শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার জায়গাও নয়; এটি যুক্তি, তথ্য, নীতিবিশ্লেষণ ও জবাবদিহির মাধ্যমে জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। সেখানে বিএনপির পক্ষে এমন কণ্ঠ থাকা দরকার, যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও বিরোধী শক্তির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে যুক্তি, তথ্য, সাংবিধানিক মূল্যবোধ ও মেধার ভিত্তিতে। আমার বিশ্বাস, সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হলে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি নীতি বোঝার ক্ষমতা, কূটনৈতিক প্রজ্ঞা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণাও জরুরি।
মেঘনা আলমের ভাষ্য-আমি নতুন মুখ হতে পারি। কিন্তু আমার বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ, জ্ঞান, দক্ষতা ও কাজের ক্ষেত্রগুলো যেন শুধু নতুন পরিচয়ের কারণে বিবেচনার বাইরে না থাকে। আমি বিশ্বাস করি, সময় আর অবদান রাখার সক্ষমতা এক বিষয় নয়। আমি অনুগ্রহ নয়, যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়নের সুযোগ চাই, যেন সংসদে দলের পাশাপাশি দেশ ও জনগণের জন্যও কার্যকর অবদান রাখতে পারি।
বিএনপির কোনো বড় নেতা, মন্ত্রী বা সংসদ সদস্য আমার আত্মীয়, এমন কোনো পরিচয় দেখানোর সুযোগ আমার নেই। এমন মন্তব্য করে তিনি লেখেন, আমার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভিত্তি রক্তের নয়, আত্মার। আমি নিজের জ্ঞান-বিবেচনায়, দেশের স্বার্থকে সামনে রেখে বিএনপিকে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ও জাতীয় স্বার্থ বিএনপির কাছে নিরাপদ এখন।
তিনি নিজেও একটি রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান জানিয়ে মেঘনা আলম লেখেন, আমার বাবা বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) এর আহ্বায়ক। এরশাদবিরোধী স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সম্মুখসারিতে থেকে লড়াই করেছেন। আমার রাজনৈতিক পথচলা তাই কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়। এর পেছনে রয়েছে পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, নিজস্ব চিন্তাভাবনা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং দেশের জন্য কাজ করার প্রত্যয়।
শেষে তিনি লেখেন, আর আজ যদি জাতীয় সংসদে বিএনপির সংসদ সদস্য হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাই, আমার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গর্ব করে বলতে পারবে, ‘আমাদের মা বিএনপির একজন নেত্রী ছিলেন’। সংসদে প্রবীণদের প্রজ্ঞার সঙ্গে তরুণদের কর্মক্ষমতা একসঙ্গে হলে দেশের ভালো হবে।

