কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর দিকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচার শাসকগোষ্ঠী ও দেশে বসে আরেকটি দল অস্থিরতা সৃষ্টিতে হাত মিলিয়েছে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিকেলে হাজী মুহম্মদ মহসিন সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠ নামে পরিচিত রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদরাসা মাঠে এক জনসভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এ অভিযোগ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই দুই পক্ষ এক হয়েছে। একজন পয়সা দিচ্ছে সীমান্তের ওপার থেকে, আরেকজন এখানে বসে অস্থিরতা তৈরি করার চেষ্টা করছে।’
দেশের বিভিন্ন এলাকায় কিছু কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচার শাসকগোষ্ঠীর অর্থ জোগানের তথ্য পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, ‘পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে, পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচার সেখানে অর্থ সরবরাহ করছে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘আরও একটি দল আছে, যারা দেশে গুজব ছড়ায়। নির্বাচনের আগে মিথ্যা কথা বলে দলটি জনগণের কাছে বিভিন্ন টিকিট বিক্রির চেষ্টা করেছে। এই দুই পক্ষ এখন এক হয়েছে।’
দেশকে অস্থিতিশীল করার এসব অপচেষ্টা সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, কেউ যেন বাংলাদেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে এবং দেশের মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন ও ভাগ্য পরিবর্তনের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।
জনসভার শুরুতে রাজশাহী অঞ্চলের ৩৮ হাজার ৯৭০ জন আখচাষির মধ্যে ১২ কোটি টাকার প্রণোদনা বিতরণ কর্মসূচি উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান বলেন, সরকার দেশে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বন্ধ কারখানা চালু করা, কৃষকদের স্বাবলম্বী করে তোলা, দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ধীরে ধীরে বেকারত্ব কমানোর জন্য কাজ করছে।
কিছু রাজনৈতিক দল রাজপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ও মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে এবং এতে সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পানির সংকট মোকাবিলা, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন ও কৃষিতে সহায়তা করতে তিস্তা ও পদ্মা নদীতে ব্যারাজ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি সরকার।
তিনি বলেন, পানির সমস্যা সমাধানে এই দুটি বড় নদীতে ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে।
পানি বণ্টনের বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, এ সমস্যার জন্য যারা দায়ী, সেই পক্ষের, অর্থাৎ ভারতের সঙ্গে তার সরকার আলোচনা করবে এবং বাংলাদেশের ন্যায্য পানির হিস্যা আদায়ে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাবে।
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের যে পানির হিস্যা পাওনা, তা আদায়ে যত দূর যাওয়া প্রয়োজন, আমরা চেষ্টা করব। ইনশাআল্লাহ, বাংলাদেশ যেন তার ন্যায্য হিস্যা পায়, তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করব।’
পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প যত দ্রুত সম্ভব শুরু ও শেষ করার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ, আমরা আমাদের পানির হিস্যা আদায়ের চেষ্টা করব। একই সঙ্গে যত কম সময়ের মধ্যে সম্ভব, পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের কাজ শুরু ও শেষ করব।’
তিনি আরও বলেন, এসব প্রকল্প দেশের মানুষের উপকারে আসবে। বিশেষ করে রাজশাহী ও আশপাশের এলাকার মানুষ এবং প্রায় ১৪টি জেলার বাসিন্দারা এর সুফল পাবেন।
নির্বাচনের আগে ফ্যামিলি কার্ড উদ্যোগ নিয়ে সমালোচনার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিরোধীরা বুঝতে পেরেছে, নির্বাচনে তাদের নিজেদের ‘টিকিট’ অবিক্রীত থেকে গেছে। এরপর তারা এ উদ্যোগ নিয়ে সমালোচনা শুরু করে।
ফ্যামিলি কার্ড, খাল খনন, বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুসহ সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে জনগণের সহযোগিতা চান তারেক রহমান।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে উৎপাদন কার্যক্রম পুনরায় চালুর জন্য সরকার ছয়টি বন্ধ কারখানা উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের কাছে হস্তান্তর করেছে।
এছাড়া আগামী জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে ১২ মাসে সরকার আরও ৪৬টি বন্ধ কারখানা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এসব কারখানা পুনরায় চালু, রপ্তানি বাড়ানো ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে কাজ চলছে।
জুলাই যোদ্ধাদের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুলাইয়ে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এবং আহত জুলাই যোদ্ধাদের চিকিৎসার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।
জামায়াতের দিকে ইঙ্গিত করে তারেক রহমান অভিযোগ করেন, ১৯৭১ সাল থেকে কিছু রাজনৈতিক শক্তি মানুষকে বিভ্রান্ত করে আসছে। সুযোগ পেলেই তারা বারবার দেশকে ভিন্ন পথে পরিচালিত করার চেষ্টা করেছে।
এসব শক্তির বিষয়ে জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের প্রশ্নে সব সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
জনসভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। বক্তব্য দেন ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এবং রাজশাহী জেলার সংসদ সদস্যরা।
কম্পিউটারে একটি বোতাম চেপে আখচাষিদের মোবাইল হিসাবে প্রণোদনার অর্থ পাঠানোর কার্যক্রম চালু করেন তিনি। এ সময় ১৫ জন আখচাষির হাতে চেকও তুলে দেন তারেক রহমান।
দুপুর ২টা ৫০ মিনিটে সামরিক উড়োজাহাজে রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরে পৌঁছে সরাসরি জনসভাস্থলে যান প্রধানমন্ত্রী। তার আগে রংপুরে সফর করেন তিনি। সেখানে একটি মন্দিরের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন শেষে রাজশাহীর উদ্দেশে রওয়ানা হন প্রধানমন্ত্রী।

