নারায়ণগঞ্জ জেলা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। গত ৬ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতিতে দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে হাতাহাতি ও উত্তেজনার ঘটনায় সংগঠনটির পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকায় সাধারণ আইনজীবীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে ফোরামের যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শামছুন নুর বাঁধনের পদত্যাগের ঘটনায় সংগঠনটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
একদিকে আইনজীবী সমিতিতে সংঘর্ষের মতো ঘটনা, অন্যদিকে সংগঠনের পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগের দৃশ্যমান অভাব সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, নারায়ণগঞ্জ জেলা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম বর্তমানে কী ভূমিকা পালন করছে? আইনজীবীদের স্বার্থ রক্ষা, পেশাগত ঐক্য বজায় রাখা এবং সংগঠনকে সক্রিয় করার ক্ষেত্রে নেতৃত্বের অবস্থান নিয়েও আলোচনা চলছে আদালতপাড়ায়।
নারায়ণগঞ্জ জেলা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির মেয়াদ তিন মাস নির্ধারণ করা হলেও দেড় বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। অথচ এখনো সম্মেলনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। সম্মেলন কবে হবে, কিংবা নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া কখন শুরু হবে, সে বিষয়েও সুনির্দিষ্ট কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছে না।
দলীয় সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন ও মহাসচিব ব্যারিস্টার কায়সার কামালের স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়।
কমিটিতে আহ্বায়ক করা হয় অ্যাডভোকেট মো. জাকির হোসেনকে। সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে রয়েছেন অ্যাডভোকেট বেনজির আহমেদ এবং সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট কাজী আব্দুল গাফফার। যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে রয়েছেন অ্যাডভোকেট জহিরুল হক, অ্যাডভোকেট মেহেবুব আরেফিন শিমু, অ্যাডভোকেট কারসার আলম চৌধুরী টুটুল, অ্যাডভোকেট আসমা বিথি ও অ্যাডভোকেট শামছুন নুর বাঁধন।
কমিটি ঘোষণার সময় তিন মাসের মধ্যে সম্মেলনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও সম্মেলনের আয়োজন না হওয়ায় সংগঠনটির সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
গত ৬ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতিতে দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা আদালতপাড়ায় উত্তেজনা সৃষ্টি করে। আইনজীবীদের মধ্যে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলেও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের পক্ষ থেকে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে সাধারণ আইনজীবীদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, আইনজীবীদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে তা নিরসনে মধ্যস্থতা, সাংগঠনিক উদ্যোগ কিংবা পেশাগত পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে ফোরামের কোনো ভূমিকা থাকার কথা কি না? সংঘর্ষের ঘটনার পর সংগঠনটির অবস্থান কী, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না, কিংবা ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না এসব বিষয়েও স্পষ্ট বক্তব্য প্রত্যাশা করছেন আইনজীবীরা।
ফোরামের যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শামছুন নুর বাঁধনের পদত্যাগের ঘটনাও সংগঠনটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে সম্মেলন না হওয়া এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্নের মধ্যে তাঁর পদত্যাগের বিষয়টি সামনে আসায় এর তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করছেন আইনজীবীদের অনেকে।
আদালতপাড়া সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নারায়ণগঞ্জ জেলা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে পুরোনো কমিটি বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক আইনজীবী মো. জিয়াউর রহমানের স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে আগের কমিটি বাতিল করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
এরপর ২৭ মার্চ নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। নতুন কমিটি গঠনের পর আদালতপাড়ায় সম্মেলন ও নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী কয়েকজন আইনজীবী নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছিলেন। বিভিন্ন বলয়ও তৈরি হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য।
কিন্তু দীর্ঘ সময়েও সম্মেলন না হওয়ায় সেই আলোচনা অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়েছে। নতুন নেতৃত্ব গঠন এবং সংগঠনের কার্যক্রম বিস্তৃত করার উদ্যোগ নিয়েও এখন প্রশ্ন উঠছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২০ সালের ৯ ডিসেম্বর। ওই সম্মেলনে দুটি প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে।
একটি প্যানেলে সভাপতি পদে অ্যাডভোকেট আব্দুল হামিদ ভাসানী, সাধারণ সম্পাদক পদে অ্যাডভোকেট আজিজ আল মামুন, সহসভাপতি পদে অ্যাডভোকেট সীমা সিদ্দিকী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান এবং সাংগঠনিক সম্পাদক পদে অ্যাডভোকেট আলী হোসাইন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
অন্য প্যানেলে সভাপতি পদে অ্যাডভোকেট সরকার হুমায়ুন কবির, সাধারণ সম্পাদক পদে অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকির, সহসভাপতি পদে অ্যাডভোকেট আজিজুল হক হান্টু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে অ্যাডভোকেট আনোয়ার প্রধান এবং সাংগঠনিক সম্পাদক পদে অ্যাডভোকেট একেএম ওমর ফারুক নয়ন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। সম্মেলনে দ্বিতীয় প্যানেল জয়লাভ করে।
পরবর্তী সময়ে ২০২২ সালের ১৬ নভেম্বর কেন্দ্রীয় কমিটি নারায়ণগঞ্জ জেলা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের ১২৫ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটির অনুমোদন দেয়। ওই কমিটিতে ২০২০ সালের সম্মেলনে নির্বাচিত পাঁচজনকে তাঁদের পদে বহাল রাখা হয়।
তবে সংশ্লিষ্টদের একাংশের অভিযোগ, ওই কমিটির কার্যকালেও সংগঠনকে প্রত্যাশিত মাত্রায় সক্রিয় করা যায়নি। পুরোনো কমিটি বাতিল করে নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হলেও দীর্ঘ সময় পরও সম্মেলন না হওয়ায় সাংগঠনিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামকে ঘিরে এখন তিনটি বিষয় আলোচনায় রয়েছে দেড় বছরের বেশি সময়েও সম্মেলন না হওয়া, আইনজীবী সমিতিতে সাম্প্রতিক সংঘর্ষের পর সংগঠনটির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন এবং যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শামছুন নুর বাঁধনের পদত্যাগ।
একটি রাজনৈতিক আদর্শভিত্তিক পেশাজীবী সংগঠনের কার্যকারিতা শুধু কমিটি ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; আইনজীবীদের পেশাগত স্বার্থ, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সাংগঠনিক ঐক্য রক্ষায় তাদের ভূমিকা কতটা দৃশ্যমান, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। নারায়ণগঞ্জ জেলা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সামনে এখন সেই প্রশ্নই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে,দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব আসবে, নাকি আহ্বায়ক কমিটির অনিশ্চিত অবস্থাই আরও দীর্ঘ হবে?

