আলমগীর আজিজ ইমনঃ নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে মেঘনা নদীর বুক দিয়ে সেদিন একটি পরিবার যাচ্ছিল স্বজনের বিয়ের অনুষ্ঠানে। সঙ্গে ছিল আনন্দ, ছিল আপনজনদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার অপেক্ষা। কেউ হয়তো ভাবেননি, কয়েক ঘণ্টার সেই যাত্রাই তাদের জীবনের শেষ যাত্রা হয়ে দাঁড়াবে।
বিয়ের বাড়িতে যাওয়ার পথে হঠাৎ ঝড়। মুহূর্তেই উত্তাল হয়ে ওঠে মেঘনা। বড় বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় পানি উঠতে শুরু করে ট্রলারে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই উল্টে যায় নৌযানটি। চোখের সামনে হারিয়ে যায় মানুষ। আর সেই স্রোতে ভেসে যায় একই পরিবারের চারটি জীবন।
এরপর পাঁচ দিন ধরে মেঘনার বুক, শাখা নদী আর তীরজুড়ে চলেছে এক হৃদয়বিদারক অপেক্ষা। স্বজনদের চোখ ছিল নদীর দিকে হয়তো ফিরে আসবে প্রিয় মানুষগুলো। কিন্তু প্রতিটি সকাল নিয়ে এসেছে আরও একটি দুঃসংবাদ। একে একে ভেসে উঠেছে বাবা ও তিন সন্তানের নিথর দেহ।
শেষ পর্যন্ত সেই অপেক্ষারও অবসান হয়েছে। তবে যে পরিবারটি বিয়ের আনন্দে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বের হয়েছিল, তারা ফিরেছে শোকের ভার নিয়ে।
ঘটনাটি ঘটে গত ২৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে। কুমিল্লার হোমনা উপজেলার শ্রীমদ্দি এলাকা থেকে স্বজনের বিয়েতে যোগ দিতে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের বৈদ্যেরবাজার এলাকার দিকে যাচ্ছিলেন তারা। ট্রলারে ছিলেন একই পরিবারের সদস্যসহ অন্য স্বজনরা। সঙ্গে ছিল বিয়ের আয়োজনের জন্য নেওয়া গরু ও ছাগলও।
ট্রলারটি সোনারগাঁয়ের বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের সোনাময়ী এলাকায় আমান সিমেন্ট কারখানার কাছাকাছি মেঘনা নদীতে পৌঁছালে হঠাৎ ঝোড়ো বাতাস শুরু হয়। নদীতে সৃষ্টি হয় প্রচণ্ড ঢেউ। একপর্যায়ে ট্রলারে পানি ঢুকে সেটি ডুবে যায়।
স্থানীয়দের সহায়তায় কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়। হেলাল উদ্দিনের স্ত্রী শিরিন বেগম ও তাঁর ছোট মেয়ে লামিয়াও প্রাণে বেঁচে যান। কিন্তু হেলাল উদ্দিন, তাঁর বড় ছেলে সজীব, মেয়ে সামিয়া এবং পাঁচ বছরের শিশু ছেলে সামিনের কোনো সন্ধান মিলছিল না। আরেক যাত্রী রায়েসা বেগমের মরদেহও দুর্ঘটনার পর উদ্ধার করা হয়।
ট্রলারডুবির পর শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল, নৌ-পুলিশ, কোস্ট গার্ডসহ সংশ্লিষ্টরা মেঘনায় তল্লাশি চালাতে থাকেন। নদীর স্রোত ছিল প্রবল। কোথাও ভেসে ওঠেনি নিখোঁজ চারজনের কোনো চিহ্ন। স্বজনদের অপেক্ষা যেন ক্রমেই ভারী হয়ে উঠছিল।
একদিকে নদীতে উদ্ধার অভিযান, অন্যদিকে তীরে দাঁড়িয়ে পরিবারের সদস্যদের কান্না কখনো যদি দেখা মেলে হেলাল, সজীব, সামিয়া আর সামিনের! কিন্তু নদী তখনও নীরব।
২৪ সেপ্টেম্বরের দুর্ঘটনার পর ২৬ সেপ্টেম্বর সকালটা হয়ে আসে পরিবারের জন্য সবচেয়ে নির্মম সময়। বৈদ্যেরবাজার এলাকার আল মোস্তফা ফ্যাক্টরির সামনে মেঘনা নদীতে ভেসে ওঠে তিনটি মরদেহ। উদ্ধারকারীরা শনাক্ত করেন তিনজনই একই পরিবারের সন্তান। তারা হলেন সজীব হোসেন, সামিয়া আক্তার ও পাঁচ বছরের শিশু সামিন হোসেন। দুই দিনের অপেক্ষার পর তিন সন্তানকে ফিরে পেল পরিবার। কিন্তু জীবিত নয় নিথর দেহ হয়ে।
একসঙ্গে তিন সন্তানের মরদেহ উদ্ধারের খবর মুহূর্তেই স্বজনদের মধ্যে যে শোকের বিস্ফোরণ ঘটায়, তার পরও একটি প্রশ্ন থেকেই যায় বাবা হেলাল উদ্দিন কোথায়? তিন সন্তানের মরদেহ পাওয়া গেলেও তখনো নদীর কোথাও পাওয়া যায়নি বাবার সন্ধান।
২৬ সেপ্টেম্বর তিন সন্তানের মরদেহ উদ্ধারের পরও থামেনি অভিযান। বরং পরিবারের শেষ আশাটুকু খুঁজে পেতে উদ্ধারকারীরা নতুন করে নদীর বিভিন্ন অংশে তল্লাশি চালাতে থাকেন। স্বজনদের জন্য অপেক্ষার সময় যেন আর কাটছিল না।
যে বাবা সন্তানদের নিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠানে যাচ্ছিলেন, সেই বাবাই তখন নিখোঁজ। আর তাঁর তিন সন্তান একে একে ফিরে এসেছে লাশ হয়ে। নদীর স্রোত হেলাল উদ্দিনকে কত দূরে নিয়ে গেছে সেটিই তখন বড় প্রশ্ন।
অবশেষে ২৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে মিলল সেই উত্তর। সোনারগাঁয়ের পিরোজপুর ইউনিয়নের হাতকোপা-রতনপুর এলাকার মাঝামাঝি মারিখালি নদীতে ভেসে ওঠে হেলাল উদ্দিনের মরদেহ। স্থানীয়রা মরদেহটি দেখতে পেয়ে খবর দিলে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে তা উদ্ধার করে। পরে স্বজনরা মরদেহ শনাক্ত করেন। এর মধ্য দিয়ে শেষ হলো পাঁচ দিনের এক দুঃসহ অপেক্ষা।
একই পরিবারের চারজন বাবা হেলাল উদ্দিন, ছেলে সজীব, মেয়ে সামিয়া এবং ছোট্ট সামিন সবাই ফিরে এলেন। তবে জীবনের পথে নয়, মৃত্যুর নীরবতায়।
যে বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল বিয়ের আনন্দে, সেখানে এখন শোক। যে পরিবারটি স্বজনের বিয়েতে অংশ নিতে নদীপথে পা বাড়িয়েছিল, তাদের ঘরে এখন কান্নার শব্দ। বিয়ের আনন্দের বদলে সেখানে উচ্চারিত হচ্ছে প্রিয়জনদের নাম। সাজসজ্জার বদলে চোখে জল, হাসির বদলে আহাজারি।
সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা একজন মা একই দুর্ঘটনায় হারিয়েছেন তাঁর স্বামী ও তিন সন্তানকে। একটি দুর্ঘটনা কয়েক মিনিটেই একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দিয়েছে। যে চারজন একসঙ্গে নদীপথে যাত্রা করেছিলেন, তারা আর কখনো একসঙ্গে ঘরে ফিরবেন না।
হেলাল উদ্দিনের পরিবার হয়তো সেদিন ভেবেছিল, বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে সবাই আবার ঘরে ফিরবেন। সন্তানদের নিয়ে হাসি-আনন্দ হবে। ছোট্ট সামিন হয়তো বাবার হাত ধরে বাড়ি ফিরবে। সামিয়া ফিরে যাবে তার আপন ঠিকানায়। সজীবও ফিরবে স্বাভাবিক জীবনে। কিন্তু মেঘনার একটি ঝড় সব হিসাব বদলে দিয়েছে।
২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর মাত্র পাঁচটি দিন। অথচ এই পাঁচ দিনে একটি পরিবার হারিয়েছে তাদের বাবা, দুই ছেলে ও এক মেয়েকে।
প্রথমে নিখোঁজ, তারপর নদীতে অপেক্ষা, এরপর একে একে মরদেহ উদ্ধার এই পাঁচ দিনের প্রতিটি মুহূর্ত স্বজনদের কাছে যেন একেকটি যুগের মতো দীর্ঘ হয়ে এসেছে। শেষ পর্যন্ত হেলাল উদ্দিনের মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে উদ্ধার অভিযান শেষ হয়েছে। কিন্তু পরিবারের শোকের কোনো শেষ নেই।
মেঘনার পানি হয়তো আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে। নদীতে আবার নৌকা চলবে, মানুষ পার হবে এক তীর থেকে অন্য তীরে। কিন্তু সোনারগাঁয়ের সেই মেঘনা তীরে একটি পরিবারের জন্য ২৪ সেপ্টেম্বরের বিকেলটি চিরকালই থেকে যাবে এক কালো স্মৃতি হয়ে যেদিন বিয়ের আনন্দযাত্রা থেমে গিয়ে একে একে নিভে গেল একটি পরিবারের চারটি জীবন।
মেঘনার ঢেউয়ে নিভে গেল এক পরিবারের আলো
Leave a Comment

