নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠেছেন বিএনপির দুই নেতা আতাউর রহমান মুকুল ও আবুল কাউসার আশা। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্কের এই চাচা-ভাতিজা এবার প্রকাশ্য বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্যে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় আতাউর রহমান মুকুলের দেওয়া একটি বক্তব্যকে ঘিরেই নতুন করে রাজনৈতিক অঙ্গনে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। ওই বক্তব্যে মুকুল বলেন, তিনি একসময় একটি ‘কালো হাতের ছায়ার’ নিচে ছিলেন। তবে তিনি ওই ‘কালো হাত’ বলতে কাকে বোঝাচ্ছেন, তা স্পষ্ট করেননি।
মুকুলের এমন মন্তব্যের পর থেকেই বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে মুকুলের কথিত ‘কালো হাত’ আসলে কে, কোন সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতার কথা তিনি বলেছেন এবং কেন এতদিন পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আনলেন।
এর মধ্যেই মুকুলের বক্তব্যের জবাব দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালামের রাজনৈতিক সচিব আবুল কাউসার আশা। তার বক্তব্যে মুকুলের অতীত রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
আবুল কাউসার আশা বলেন, “একজন বলেছেন, তিনি নাকি সারাজীবন কালো হাতের ছায়ার নিচে ছিলেন। জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে বিশ্বাসী সবাই জানতে চায়, সেই কালো হাতটি কে ছিলেন। কারণ, যিনি এই বক্তব্য দিয়েছেন, তিনি কয়েক দিন পরপর বিভিন্ন হাতের নিচে গিয়েছেন।”
তিনি আরও বলেন, “কখনো কালাম সাহেবের ভাই, আবার কখনো ওসমান পরিবারের লোকও তিনি ছিলেন। সুতরাং কালো হাত বলতে তিনি কাকে বুঝিয়েছেন, তা স্পষ্ট করে বললে তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সবার সুবিধা হতো। এমনিতেই বিগত উপজেলা নির্বাচনে জনগণ সিদ্ধান্ত দিয়েছে।”
আশা আরও বলেন, “আপনারা যেভাবে মন চায় রাজনীতি করেন। তবে মুনাফেকদের হাত থেকে রক্ষা পাবেন, মুনাফেকদের কাছ থেকে দূরে থাকবেন। এই মুনাফেক চরিত্রের রাজনীতিবিদ যারা আছেন, তাদের বয়কট করি।”
আশার এই বক্তব্যের পর চাচা-ভাতিজার রাজনৈতিক বিরোধ নতুন মাত্রা পেয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের অনেকে। মুকুলের বক্তব্যে যে ইঙ্গিত ছিল, আশার পাল্টা বক্তব্যে সেটি আরও স্পষ্ট রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ নিয়েছে বলে তাদের অভিমত।
চাচা-ভাতিজার বর্তমান রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পেছনে রয়েছে কয়েক বছরের পুরনো রাজনৈতিক সম্পর্ক ও অবস্থান পরিবর্তনের ইতিহাস। ২০২২ সালে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির কমিটি ঘোষণার পর দুজনই দলীয় পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। এরপর সময়ের সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও কর্মকাণ্ডে ভিন্নতা স্পষ্ট হতে থাকে।
স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের একাংশের মতে, মুকুলের সাম্প্রতিক বক্তব্য অতীতের কিছু রাজনৈতিক অধ্যায়কে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে তার বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক যোগাযোগ ও অবস্থান নিয়ে দলের ভেতরে যে আলোচনা রয়েছে, ‘কালো হাতের ছায়া’ মন্তব্যের পর সেটিই নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
অন্যদিকে আবুল কাউসার আশা বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালামের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগী হিসেবে সক্রিয় রয়েছেন। ফলে চাচা-ভাতিজার রাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্যও এখন প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকে মনে করছেন, মুকুল-আশার এই বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্যকে কেবল ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন এবং বন্দর এলাকার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রভাব ও সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণের বিষয়ও জড়িয়ে থাকতে পারে।
বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির রাজনীতি নতুনভাবে সাজানোর প্রক্রিয়ার মধ্যে দুই নেতার প্রকাশ্য অবস্থানকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মুকুলের ‘কালো হাত’ বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ফলে তার বক্তব্যকে ঘিরে বিএনপির ভেতরে নানা ধরনের ব্যাখ্যা ও আলোচনা চলছে।
অন্যদিকে আশার পাল্টা বক্তব্য সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এতে একসময় একই রাজনৈতিক পরিসরে থাকা চাচা-ভাতিজার সম্পর্কের টানাপোড়েন প্রকাশ্য রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়েছে।
এখন দেখার বিষয়, মুকুল-আশার এই বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্য কেবল ব্যক্তিগত রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি এর প্রভাব নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন ও বন্দর এলাকার বিএনপির রাজনীতিতে নতুন কোনো মেরুকরণ তৈরি করে। সেদিকেই এখন নজর স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের।

