ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির রাজনীতিতে যে অভ্যন্তরীণ বিভাজন তৈরি হয়েছিল, নির্বাচনের পর তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জেলা ও মহানগর বিএনপিতে একাধিক বলয়, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, পদ-পদবি নিয়ে প্রতিযোগিতা এবং শীর্ষ নেতাদের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে যাওয়ার কারণে দলটির সাংগঠনিক কাঠামো অনেকটাই চাপে পড়েছে বলে মনে করছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।
এর মধ্যেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে রুহুল কবির রিজভীর দায়িত্ব গ্রহণকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ভূমিকা পালন করা রিজভীর সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের পুরোনো যোগাযোগ থাকায় স্থানীয় কমিটি পুনর্গঠনেও তার প্রভাব থাকবে এমন আলোচনা চলছে দলটির ভেতরে।
ফলে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর বিএনপির কমিটি পুনর্গঠন নিয়ে ফের তৎপর হয়ে উঠেছেন পদপ্রত্যাশী নেতারা। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে যোগাযোগ, ঢাকায় দৌড়ঝাঁপ এবং নিজেদের সমর্থক নেতাকর্মীদের সক্রিয় করার পাশাপাশি বিভিন্ন বলয়ও নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির বর্তমান আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ। তবে দলের সাংগঠনিক দায়িত্বের পাশাপাশি জেলা পরিষদের প্রশাসকসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকায় তাকে ঘিরে নতুন কমিটিতে কী সিদ্ধান্ত আসে, সেটিই এখন আলোচনার বড় বিষয়।
দলীয় সূত্রের দাবি, নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে মাঠে সক্রিয়, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রাখা এবং তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির কয়েকজন নেতাকে নিয়ে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পদ নিয়েও চলছে নানা হিসাব। এ ক্ষেত্রে জেলা বিএনপির বর্তমান দ্বিতীয় যুগ্ম আহ্বায়ক মাশুকুল ইসলাম রাজীবের নাম আলোচনায় রয়েছে। তিনি এর আগে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশী ছিলেন। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় দলীয় পদে তার ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়েও চলছে নানা আলোচনা।
তবে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় বিএনপি পুরোনো নেতৃত্বকে বহাল রাখবে, নাকি নতুন নেতৃত্ব সামনে আনবে এখনো তা নিশ্চিত নয়।
জেলা বিএনপির তুলনায় মহানগর বিএনপির নতুন কমিটি নিয়ে আগ্রহ আরও বেশি। কারণ দীর্ঘদিন ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ ৪১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
২০২২ সালে গঠিত মহানগর বিএনপির কমিটিতে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে আহ্বায়ক এবং অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপুকে সদস্যসচিব করা হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে কমিটির অনেক নেতার রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন হয়েছে, কেউ বিভিন্ন দায়িত্বে গেছেন, আবার কেউ সক্রিয় রাজনীতি থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছেন।
এর মধ্যে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব পাওয়ায় মহানগর বিএনপির নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে সাখাওয়াত হোসেন খানকে ঘিরে আলাদা রাজনৈতিক হিসাব রয়েছে। ফলে মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক নেতৃত্বে তার পরিবর্তে নতুন কাউকে আনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
মহানগর বিএনপির নতুন কমিটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি যে কয়েকটি নাম ঘুরেফিরে সামনে আসছে, তার মধ্যে রয়েছেন অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু, মনিরুল ইসলাম সজল, ফতেহ মুহাম্মদ রেজা রিপন ও আবুল কাউসার আশা।
তবে চার নেতার রাজনৈতিক অবস্থান ও সাংগঠনিক শক্তি এক নয়। প্রত্যেকেরই রয়েছে আলাদা কর্মী-সমর্থক বলয় এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড।
আবু আল ইউসুফ খান টিপু দীর্ঘদিন মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দলের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকার কারণে তার নিজস্ব কর্মীভিত্তি রয়েছে। বর্তমান কমিটির অভিজ্ঞ নেতৃত্বের অংশ হিসেবেও তার নাম গুরুত্ব পাচ্ছে।
মনিরুল ইসলাম সজল দীর্ঘদিনের মাঠের রাজনীতির কারণে মহানগরের তৃণমূলে পরিচিত মুখ। নতুন নেতৃত্বে অপেক্ষাকৃত সক্রিয় ও মাঠকেন্দ্রিক নেতৃত্ব চাইলে তার নাম বিবেচনায় আসতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে।
জাকির খান নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে জনপ্রিয় এক নাম মহানগর বিএনপির নতুন কমিটিতে গুরুত্বপূন পদে দেখা যেতে পারে।
মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি রাজপথের নির্যাতিত এক নেতা নারায়ণগঞ্জে বিএনপির রাজনীতি করতে গিয়ে ৮৫ টির উপরে মামলার আমামী হয়ে ১২ বারের উপর জেল খেটেছেন । মহানগর বিএনপির নতুন কমিটিতে তাকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে।
অন্যদিকে আবুল কাউসার আশা মহানগর বিএনপির রাজনীতিতে বর্তমানে আলোচিত একটি নাম। দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি সংসদীয় এলাকার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকায় নতুন কমিটিতে তার ভূমিকা কী হয়, তা নিয়েও নেতাকর্মীদের আগ্রহ রয়েছে। তবে এসব নামের কোনোটিই এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় বিএনপির আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নয়।
নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে এবার বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে কয়েকটি বিষয় আন্দোলনে ভূমিকা, মামলা-হামলা ও কারাবরণের ইতিহাস, মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক সক্ষমতা, নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি।
তৃণমূলের একটি অংশের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে যারা মাঠে ছিলেন কিন্তু পদ-পদবিতে পিছিয়ে ছিলেন, নতুন কমিটিতে তাদের মূল্যায়ন করা উচিত। অন্যদিকে বর্তমান ও সাবেক নেতাদের একটি অংশ মনে করছেন, অভিজ্ঞতা ছাড়া হঠাৎ করে নতুন নেতৃত্ব সামনে আনলে সাংগঠনিক সমস্যা আরও বাড়তে পারে। এই দুই মতের সংঘাতই নতুন কমিটি গঠনের সময় বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
রুহুল কবির রিজভী নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির জন্য নতুন কোনো নাম নন। এর আগেও নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর বিএনপির বিভিন্ন কমিটি গঠনের সঙ্গে তার সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা ছিল। ফলে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার পর তার সঙ্গে যোগাযোগ থাকা স্থানীয় নেতাদের অনেকেই নতুন করে সক্রিয় হয়েছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
বিশেষ করে জেলা, মহানগর, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদলসহ বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের মধ্যে নতুন কমিটি নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।
তবে ‘রিজভীপন্থী’ বা ‘রিজভী বলয়’ হিসেবে কাউকে চিহ্নিত করে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তালিকা প্রকাশিত হয়নি। ফলে এ ধরনের রাজনৈতিক সমীকরণকে আপাতত স্থানীয় নেতাদের অভ্যন্তরীণ হিসাব-নিকাশ হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিগত সময়ে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির সাংগঠনিক বিষয়গুলোতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নজর ছিল বলে স্থানীয় নেতাদের মধ্যে আলোচনা ছিল। বিভিন্ন সময়ে নারায়ণগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের নিয়ে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে মতামত নেওয়া হয়েছে।
এখন রিজভী ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হওয়ায় কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। আর এই পরিবর্তনকে সামনে রেখে স্থানীয় নেতারাও নিজেদের অবস্থান নতুন করে পরিমাপ করছেন।
কে কেন্দ্রের কাছাকাছি, কে মাঠে সক্রিয়, কার সঙ্গে তৃণমূলের যোগাযোগ বেশি এসব প্রশ্ন এখন নারায়ণগঞ্জ বিএনপির অভ্যন্তরে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে জেলা ও মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়ছে। বিশেষ করে ওয়ার্ড, থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে দলীয় কাঠামো সক্রিয় না থাকলে নির্বাচনী রাজনীতিতে তার প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন নেতাকর্মীরা।
এ কারণে নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে শুধু শীর্ষ পদ নয়, তৃণমূলের সাংগঠনিক কাঠামোকেও গুরুত্ব দেওয়ার দাবি রয়েছে।
বিএনপির ভেতরে স্থানীয় নির্বাচনে একক প্রার্থী দেওয়ার নীতির কথা সামনে আসায় মহানগর ও জেলার সাংগঠনিক নেতৃত্বের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
নতুন কমিটি হলে সবচেয়ে বড় প্রশ্নবর্তমান কমিটির কারা থাকছেন আর কারা বাদ পড়ছেন? দলীয় সূত্রগুলোর দাবি, দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা, সাংগঠনিক কর্মসূচিতে অনুপস্থিতি, তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব এবং একাধিক বলয়ে বিভক্তির সঙ্গে জড়িত নেতাদের বিষয়ে কেন্দ্র কঠোর অবস্থান নিতে পারে।
অন্যদিকে যারা আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন, মামলা-মোকদ্দমা ও কারাবরণের শিকার হয়েছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে দলীয় কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছেন তাদের একটি অংশ নতুন কমিটিতে জায়গা পেতে পারেন বলে প্রত্যাশা করছেন। তবে শেষ মুহূর্তে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তই সব হিসাব পাল্টে দিতে পারে।
নারায়ণগঞ্জ বিএনপির সামনে নতুন কমিটির চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সাংগঠনিক ঐক্য ফিরিয়ে আনা। বিভিন্ন সময়ে কর্মসূচি, পদ-পদবি, নেতৃত্বের আধিপত্য কিংবা স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নেতাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই দলের নেতাদের পৃথক কর্মসূচি পালন এবং পাল্টাপাল্টি বক্তব্যও তৃণমূলের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে।
তাই নতুন কমিটি হলে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা বাস্তবায়ন, তৃণমূলের সঙ্গে সমন্বয় এবং একক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠাই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। কেন্দ্রীয় বিএনপির কাউন্সিল ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জ বিএনপিতে এখন যে রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে, তা আগামী কয়েক মাসে আরও দৃশ্যমান হতে পারে।
জেলা বিএনপিতে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদ, মহানগরে আহ্বায়ক-মহানগর নেতৃত্ব এবং থানা-ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটি—সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জ বিএনপিতে বড় ধরনের পুনর্বিন্যাসের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
তবে শেষ পর্যন্ত রিজভীর নতুন দায়িত্ব স্থানীয় কমিটিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, বর্তমান নেতৃত্বের কতজন টিকে থাকবেন, কারা নতুন করে উঠে আসবেন এবং কোন বলয় সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়। নারায়ণগঞ্জ বিএনপির রাজনীতিতে তাই প্রশ্ন এখন একটাই পুরোনো সমীকরণের ধারাবাহিকতা, নাকি নতুন নেতৃত্বের উত্থান?

