নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোতে আসন্ন কমিটিকে ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা। দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ দূরত্ব, সাংগঠনিক নিষ্ক্রিয়তা, সমন্বয়হীনতা ও নেতৃত্বের বলয়ভিত্তিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পদপ্রত্যাশীদের তৎপরতা। ফলে একই সংগঠনের নেতাকর্মীদের একটি অংশ একদিকে এবং অন্য অংশ আরেকদিকে অবস্থান নিয়ে পৃথক কর্মসূচি ও শোডাউনের মাধ্যমে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি জানান দিচ্ছেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এসব বিভক্তিকে শুধু অভ্যন্তরীণ বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সামনে জেলা ও মহানগরের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নতুন নেতৃত্ব নির্ধারণের সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পদপ্রত্যাশী নেতারা মাঠে সক্রিয় হচ্ছেন। কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতে কার নেতৃত্বে কত বেশি নেতাকর্মী উপস্থিত হচ্ছে, কে কত বড় মিছিল করতে পারছেন এসবও এখন অনেকটা নেতৃত্বের সক্ষমতা প্রদর্শনের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে।
২০২৩ সালের ২৯ আগস্ট রাতে তৎকালীন যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম মিল্টন নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদলের তিন সদস্যের আহ্বায়ক কমিটির অনুমোদন দেন। কমিটিতে সাদেকুর রহমান সাদেককে আহ্বায়ক, খায়রুল ইসলাম সজীবকে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এবং মশিউর রহমান রনিকে সদস্য সচিব করা হয়। ৫১ সদস্যের কমিটি হওয়ার কথা থাকলেও হয়নি।
তবে চলতি বছরের ২১ জুন নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদলের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। নানা অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক খায়রুল ইসলাম সজীবকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ যুবদলের সব পদ থেকে বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় যুবদল। কেন্দ্রীয় যুবদলের সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম নয়ন এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করেন।
সজীবকে বহিষ্কারের পর ২০২৩ সালের তিন সদস্যের কমিটির কার্যকর নেতৃত্বে রয়েছেন মূলত আহ্বায়ক সাদেকুর রহমান সাদেক ও সদস্য সচিব মশিউর রহমান রনি। তবে সজীবের স্থলাভিষিক্ত করে নতুন কাউকে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক পদে বসানো হয়েছে এমন কোনো নির্ভরযোগ্য কেন্দ্রীয় ঘোষণা এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
২০২৫ সালের শুরুতে জেলা যুবদলের পক্ষ থেকে ৫১ সদস্যের একটি বর্ধিত আহ্বায়ক কমিটি করার কথা জানানো হয়েছিল। সে সময় জেলা যুবদলের আহ্বায়ক সাদেকুর রহমান সাদেক জানিয়েছিলেন, কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ কমিটি নয়, বরং ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বর্ধিত করা হবে এবং তা শিগগিরই ঘোষণা করা হবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই কমিটি ঘোষণার নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।
ফলে দীর্ঘদিন ধরে জেলা যুবদলের সাংগঠনিক কার্যক্রম মূলত ওই তিন নেতাকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হয়ে আসছিল। স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাদের মধ্যে রাজনৈতিক বলয়ভিত্তিক দূরত্বের কথাও উঠে এসেছে।
নারায়ণগঞ্জ মহানগর যুবদলের বর্তমান কমিটিতে আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম সজল ও সদস্য সচিব শাহেদ আহমেদ নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ২০২৩ সালের ২৯ আগস্ট ঘোষিত তিন সদস্যের আহ্বায়ক কমিটিতে সজলের সঙ্গে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন সাগর প্রধান এবং সদস্য সচিব ছিলেন শাহেদ আহমেদ। পরবর্তীতে ৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটিও গঠন করা হয়।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে মহানগর যুবদলের রাজনীতিতে সজল-সাহেদের নেতৃত্বের বাইরে পৃথক বলয়ের তৎপরতা দৃশ্যমান হয়েছে। জোসেফ ও সাগর প্রধানকে ঘিরে বিভিন্ন কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে নতুন সমীকরণের আলোচনা তৈরি হয়েছে।
তবে জোসেফকে নিয়ে অবস্থান পরিষ্কার করেছে কেন্দ্রীয় যুবদল। ২০২৬ সালের জুনে দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে কেন্দ্র জানায়, মহানগর যুবদলের বর্তমান ৫১ সদস্যের কমিটিতে কে এম মাজহারুল ইসলাম জোসেফ নামে কেউ নেই। ফলে জোসেফের তৎপরতাকে আনুষ্ঠানিক সাংগঠনিক নেতৃত্বের পরিবর্তে একটি রাজনৈতিক বলয়ের তৎপরতা হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
নারায়ণগঞ্জ জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলেও বিভক্তির চিত্র বেশ স্পষ্ট। বর্তমান আহ্বায়ক মাহাবুবুর রহমান, সদস্য সচিব সালাহউদ্দিন সালু এবং সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম রফিককে নিয়ে ২০২৩ সালের অক্টোবরে ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন করা হয়েছিল।
কমিটি ঘোষণার পর বিভিন্ন সময়ে তিন নেতাকে একই কর্মসূচিতে দেখা গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে তাদের রাজনৈতিক তৎপরতায় পৃথক অবস্থানের বিষয়টি সামনে এসেছে। একদিকে মাহাবুবুর রহমানের নেতৃত্বে একটি অংশ, অন্যদিকে সালাহউদ্দিন সালু ও রফিকুল ইসলাম রফিককে ঘিরে আরেকটি অংশ সক্রিয় রয়েছে বলে নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে আগামী দিনের জেলা কমিটি। দীর্ঘদিন ধরে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন কমিটিতে কারা শীর্ষ পদে আসছেন, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। অতীতেও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে মাহাবুবুর রহমান, সালাউদ্দিন সালু ও রফিকুল ইসলাম রফিকসহ একাধিক নেতার নাম সম্ভাব্য নেতৃত্ব হিসেবে আলোচনায় ছিল।ফলে বর্তমান কমিটির অভ্যন্তরীণ সমীকরণ এখন ভবিষ্যৎ কমিটির পদ-পদবি পাওয়ার হিসাবের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নারায়ণগঞ্জ মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতৃত্বে রয়েছেন আহ্বায়ক শাখাওয়াত ইসলাম রানা ও সদস্য সচিব মমিনুর রহমান বাবু। ২০২৪ সালের বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাদের নেতৃত্বে মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের বড় মিছিলের উপস্থিতির নজিরও রয়েছে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ সংগঠনের ভেতরেও একাধিক বলয়ের সক্রিয়তা বেড়েছে বলে স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবি। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীসহ কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতে বর্তমান নেতৃত্বের পাশাপাশি পৃথক নেতাদের নেতৃত্বে বড় আকারে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিব এবং সদর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর বেপারীর নেতৃত্বে একটি অংশের পৃথক তৎপরতার কথা উঠে এসেছে। একইভাবে সাবেক সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান জিয়ার নেতৃত্বেও দীর্ঘদিন ধরে পৃথক রাজনৈতিক বলয়ের কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে।
বিএনপির অঙ্গসংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ এই বিভাজনের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রকাশ ঘটছে দলীয় কর্মসূচিতে। একই কর্মসূচিতে কার নেতৃত্বে বেশি নেতাকর্মী অংশ নিচ্ছেন, কার ব্যানারে বড় মিছিল হচ্ছে কিংবা কে বেশি সাংগঠনিক উপস্থিতি দেখাতে পারছেন তা নিয়ে এক ধরনের নীরব প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এর পেছনে শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকার বিষয়টি নয়; ভবিষ্যৎ কমিটিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার হিসাবও কাজ করছে। কেন্দ্রীয় নেতাদের নজরে নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা তুলে ধরতেই অনেক পদপ্রত্যাশী পৃথকভাবে কর্মী সমাবেশ ও কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন।
ফলে একদিকে বর্তমান নেতৃত্ব নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চাইছে, অন্যদিকে সম্ভাব্য নতুন নেতৃত্ব নিজেদের শক্ত ঘাঁটি তৈরির চেষ্টা করছে।
তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মীর প্রশ্ন, একই দলের কর্মসূচিতে যদি একাধিক নেতৃত্ব নিজেদের শক্তি প্রদর্শনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে সাংগঠনিক ঐক্য ও চেইন অব কমান্ড কতটা কার্যকর থাকবে?
তাদের মতে, বিএনপির দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের সময়ে যারা মাঠে সক্রিয় ছিলেন, তাদের মূল্যায়নের পাশাপাশি সংগঠনের ঐক্য, কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং দলীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতাকেও নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা রাজনৈতিক সংগঠনে স্বাভাবিক হলেও তা যদি ব্যক্তিকেন্দ্রিক বলয়, পরস্পরবিরোধী কর্মসূচি কিংবা প্রকাশ্য বিভক্তিতে রূপ নেয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত সাংগঠনিক কাঠামোই দুর্বল হয়। নারায়ণগঞ্জের অঙ্গসংগঠনগুলোতে বর্তমানে যে প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে, নতুন কমিটি ঘোষণার পর সেটি ঐক্যের দিকে যায় নাকি আরও বড় বিভাজনের জন্ম দেয় এখন সেটিই দেখার বিষয়।

