নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির বর্তমান আহ্বায়ক কমিটি পরিবর্তন করে নতুন কমিটি গঠন করা হবে কি না এ নিয়ে দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক আড্ডায় সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। তবে এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় বিএনপির পক্ষ থেকে নারায়ণগঞ্জ মহানগর কমিটি ভেঙে দেওয়ার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসেনি।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে তৎকালীন মহানগর কমিটি বিলুপ্ত করে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে আহ্বায়ক এবং অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপুকে সদস্য সচিব করে ৪১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেছিল বিএনপি।
এরপর প্রায় চার বছর ধরে একই আহ্বায়ক কমিটি দিয়েই সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে মহানগর বিএনপি। ২০২৫ সালেও স্থানীয় গণমাধ্যমে কমিটিটির মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া এবং নতুন নেতৃত্ব আসার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা প্রকাশিত হয়েছিল।
তবে বর্তমান কমিটির নেতাকর্মীদের দাবি, বিগত বছরগুলোতে সরকারবিরোধী আন্দোলন, নির্বাচনের আগের রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনসহ বিভিন্ন সময়ে মহানগর বিএনপির নেতাকর্মীরা মাঠে সক্রিয় ছিলেন। সাম্প্রতিক সময়েও মহানগর বিএনপিকে সাংগঠনিক কর্মসূচিতে দেখা গেছে। জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষে ২০২৬ সালের ১৬ জুলাই মহানগর বিএনপির নেতারা হাজীগঞ্জের জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
অন্যদিকে, বর্তমান আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্বেও রয়েছেন। চলতি বছরের মে মাসে স্থানীয় গণমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে তাকে নাসিক প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
এ কারণে দলের একটি অংশ মনে করছে, সাখাওয়াত হোসেন খানকে মহানগর বিএনপির নেতৃত্বে বহাল রাখার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশেষ করে ভবিষ্যতে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সামনে রেখে তার রাজনৈতিক অবস্থানও আলোচনায় আসছে। তবে মেয়র পদে বিএনপির পক্ষ থেকে কাকে সমর্থন দেওয়া হবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসেনি।
অন্যদিকে মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপুকেও সম্ভাব্য নেতৃত্বের আলোচনায় রাখছেন দলের একটি অংশ। দীর্ঘদিন ধরে মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমে সক্রিয় থাকা টিপু ২০২৬ সালেও বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। জুন মাসে তার নেতৃত্বে মহানগর বিএনপির নেতাকর্মীরা একটি বিক্ষোভ মিছিলও করেন।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের আরেকটি অংশ অবশ্য পুরোনো নেতৃত্বের বাইরে নতুন মুখ আনার পক্ষে। তাদের যুক্তি, দীর্ঘদিন আহ্বায়ক কমিটি বহাল থাকার কারণে সাংগঠনিক কাঠামোকে আরও সক্রিয় করতে সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করা প্রয়োজন। ২০২৫ সালে প্রকাশিত স্থানীয় এক প্রতিবেদনে মহানগর বিএনপির নতুন কমিটিতে ‘ক্লিন ইমেজের’ নেতৃত্বকে প্রাধান্য দেওয়ার আলোচনা সামনে এসেছিল।
সম্ভাব্য নেতৃত্বের আলোচনায় রয়েছেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য ও মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম, বর্তমান আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান, সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু, সাবেক সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামাল, সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সবুর খান সেন্টু, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট জাকির হোসেন, সরকার হুমায়ুন কবির, শাহ ফতেহ মোহাম্মদ রেজা রিপন, আবুল কাউসার আশা, সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আতাউর রহমান মুকুল, মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ, সদর থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এইচএম আনোয়ার প্রধান, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শওকত হাশেম শকু, মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম সজল এবং বন্দর থানা বিএনপির সভাপতি শাহেন শাহ আহমেদসহ আরও কয়েকজন।
এর মধ্যে আবুল কালামের পক্ষে থাকা নেতাকর্মীরা মনে করছেন, মহানগর বিএনপির পুরোনো সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে তাকে আবারও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আনা যেতে পারে। ২০১৭ সালে আবুল কালামকে সভাপতি ও এটিএম কামালকে সাধারণ সম্পাদক করে মহানগর বিএনপির আংশিক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। পরে ২০১৯ সালে ওই কমিটির পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া হয়।
তবে বর্তমান নেতৃত্বের পক্ষের নেতাকর্মীদের বক্তব্য, সাখাওয়াত-টিপুর নেতৃত্বাধীন কমিটি আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ সময় পার করেছে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতেও সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় রয়েছে। ফলে শুধু মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে কমিটি পরিবর্তন করা হবে এমন সিদ্ধান্তের সঙ্গে তারা একমত নন।
এদিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসের আলোচনা থাকলেও নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির কমিটি নিয়ে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন সময়ে বিএনপির বিভিন্ন জেলা ও ইউনিটে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন কমিটি দেওয়ার নজির রয়েছে। ২০২৫ সালে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির পুরোনো কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছিল।
ফলে মহানগর বিএনপির ক্ষেত্রেও শেষ পর্যন্ত কেন্দ্র কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। বর্তমান কমিটি বহাল থাকবে, নাকি নতুন আহ্বায়ক কমিটি আসবে তা নির্ভর করছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের ওপর।
তবে কমিটি পরিবর্তনের আলোচনা যতই বাড়ছে, ততই স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে মেরুকরণও স্পষ্ট হচ্ছে। কেউ সাখাওয়াতকে বহাল রাখার পক্ষে, কেউ টিপুকে সামনে দেখতে চান, আবার কেউ আবুল কালামসহ পুরোনো নেতৃত্বের প্রত্যাবর্তনের পক্ষে। পাশাপাশি নতুন মুখ সামনে আনার দাবিও রয়েছে।
সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপিতে এখন মূল প্রশ্ন একটাই বর্তমান নেতৃত্বই থাকবে, নাকি দীর্ঘদিনের আহ্বায়ক কমিটির অবসান ঘটিয়ে নতুন নেতৃত্বের হাতে তুলে দেওয়া হবে মহানগরের সাংগঠনিক দায়িত্ব। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত এ নিয়ে আলোচনা ও জল্পনা-কল্পনা চলতেই থাকবে।

