নারায়ণগঞ্জে বিএনপির কিছু নেতার বিতর্কিত কর্মকাণ্ডকে ঘিরে দলটির ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বলে মনে করছেন তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী। তাদের দাবি, জনগণের আস্থা ধরে রাখতে এবং সংগঠনের গ্রহণযোগ্যতা অক্ষুণ্ন রাখতে দ্রুত সাংগঠনিক শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে পরিচ্ছন্ন ও ত্যাগী নেতৃত্বকে সামনে আনা এখন সময়ের দাবি।
দলীয় নেতাকর্মীদের মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনের পর ক্ষমতায় আসা বিএনপির প্রতি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার। বিশেষ করে চাঁদাবাজি, দখল, সন্ত্রাস, প্রভাব বিস্তার এবং রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের মতো কর্মকাণ্ডের অবসান ঘটবে—এমন আশাই করেছিলেন অনেকেই। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ওঠা নানা অভিযোগ সেই প্রত্যাশাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষ্য, জনগণ এখন জবাবদিহিমূলক রাজনীতি দেখতে চায়। ফলে কোনো ব্যক্তি দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধে জড়িয়ে পড়লে তার দায় কেবল ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং পুরো সংগঠনের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ কারণেই রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে কঠোর শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতি, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, দখল এবং চাঁদাবাজির অভিযোগ সামনে আসে। এসব ঘটনার কয়েকটিতে বিএনপির পরিচয়ধারী কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। যদিও অনেক অভিযোগের তদন্ত এখনও চলমান এবং অধিকাংশ বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এ ছাড়া সদর, ফতুল্লা, বন্দর, আড়াইহাজার ও রূপগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় বাড়িঘরে হামলা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, শিল্পপ্রতিষ্ঠান দখলের চেষ্টা এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একই সময়ে শহরের বিভিন্ন ঘাট, বাস টার্মিনাল, হকার নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ স্ট্যান্ড এবং বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজির অভিযোগও বিভিন্ন মহল থেকে উঠে এসেছে।
স্থানীয়দের একটি অংশের অভিযোগ, কিছু ব্যক্তি বিএনপির নাম ব্যবহার করে ভূমি দখল, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা কিংবা ব্যবসায়িক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। অন্যদিকে বিএনপির একাধিক নেতার দাবি, অভিযুক্তদের সবাই প্রকৃত দলীয় কর্মী নন। তাদের ভাষ্য, রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন সুবিধাবাদী ব্যক্তি নিজেদের স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে বিএনপির পরিচয় ব্যবহার করছেন। এমন অভিযোগও রয়েছে, অতীতে অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিচয় পরিবর্তন করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন।
তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ক্ষমতার পরিবর্তনের পর এমন কিছু ব্যক্তির আর্থিক অবস্থারও অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটেছে, যারা আগে ব্যক্তিগত ব্যয় নির্বাহ করতেও হিমশিম খেতেন। যদিও এসব অভিযোগের সপক্ষে আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা বিচারিক সিদ্ধান্ত এখনও প্রকাশিত হয়নি।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বিভিন্ন সময় দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে আসছে। দলীয় সভা, কর্মশালা ও জনসভায় নেতারা স্পষ্টভাবে বলেছেন, জনগণের আস্থা অর্জন করতে হলে দলের নেতাকর্মীদের আইন মেনে চলতে হবে এবং এমন কোনো কর্মকাণ্ডে জড়ানো যাবে না, যাতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। একই সঙ্গে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও কেন্দ্র থেকে বারবার জানানো হয়েছে।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সংঘটিত অপরাধ শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতারও প্রশ্ন। তাই প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং নির্দোষ ব্যক্তিদের হয়রানি থেকে রক্ষা—এই তিনটি বিষয় সমান গুরুত্বের সঙ্গে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তাদের মতে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে সততা, ত্যাগ, সাংগঠনিক দক্ষতা ও জনগ্রহণযোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলে সুবিধাবাদী ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশ অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, দখল বা সন্ত্রাসের অভিযোগ প্রমাণিত হলে দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের ভেতর থেকেই জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। নারায়ণগঞ্জে যেসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হলে একদিকে যেমন আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে, অন্যদিকে বিএনপির সাংগঠনিক ভাবমূর্তিও আরও শক্তিশালী হবে।
তাদের মতে, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, অপরাধের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা গেলে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা সহজ হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন এবং সুবিধাবাদী ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণই একটি রাজনৈতিক দলের দীর্ঘমেয়াদি গ্রহণযোগ্যতা ও জনবিশ্বাস ধরে রাখার অন্যতম পূর্বশর্ত।

