নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে একসময় প্রভাবশালী তরুণ নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন জেলা যুবদলের বহিষ্কৃত সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক খাইরুল ইসলাম সজীব। তবে চাঁদাবাজির অভিযোগ, দলীয় বহিষ্কার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদের পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তার রাজনৈতিক অবস্থানে নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও স্থানীয় সূত্রের দাবি, মুচলেকায় মুক্তি পাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে গেছেন।
সূত্র থেকে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলামের ছেলে খাইরুল ইসলাম সজীবের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই সিদ্ধিরগঞ্জ, সোনারগাঁ ও কাঁচপুর শিল্পাঞ্চলে চাঁদাবাজি, ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, পণ্যবাহী ট্রাক থেকে অর্থ আদায় এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ছিল। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২১ জুন রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হেফাজতে নেয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তাকে প্রায় ১২ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। সে সময় পুলিশ জানিয়েছিল, তার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্যই তাকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল। তবে তার বিরুদ্ধে কোনো মামলায় তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি।
ঘটনার পরপরই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সজীবকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ দল থেকে বহিষ্কার করে। সহ-সভাপতি নুরুল ইসলাম সোহেলের স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, তার ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের দায় দল নেবে না এবং নেতাকর্মীদের তার সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এদিকে বিএনপির একাধিক স্থানীয় নেতা ও রাজনৈতিক সূত্রের দাবি, মুক্তির সময় সজীবকে ভবিষ্যতে সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে থাকার বিষয়ে একটি মুচলেকা দিতে হয়েছে। একই সঙ্গে দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যাওয়ার শর্তও ছিল বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা সংশ্লিষ্ট কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।
রাজনৈতিক সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, মুচলেকার কয়েক দিনের মধ্যেই সজীব বিদেশে পাড়ি জমান। তিনি বর্তমানে ইউরোপের একটি দেশে অবস্থান করছেন বলে দাবি করা হলেও, কোন দেশে গেছেন সে বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এ বিষয়ে তার পরিবার কিংবা বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শিল্প-সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির অভিযোগ, সজীবের অনুসারীরা শিল্পাঞ্চলে ট্রাক চলাচল, ঝুট ব্যবসা এবং বিভিন্ন কারখানাকে কেন্দ্র করে প্রভাব বিস্তার করতেন। অভিযোগ অনুযায়ী, দাবি করা অর্থ না দিলে পণ্য পরিবহনে বাধা সৃষ্টি এবং বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করা হতো। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সজীবের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে কোনো লিখিত বা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যের ছেলের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ওঠা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নেওয়া, দলীয় বহিষ্কার এবং পরে দেশত্যাগের ঘটনা স্থানীয় রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে এ ঘটনায় ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা, আইনের সমান প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্নও সামনে এসেছে।
তবে মুচলেকার শর্ত, বিদেশে পাঠানো বা স্থায়ীভাবে রাজনীতি ছাড়ার বিষয়ে যে তথ্য বিভিন্ন রাজনৈতিক সূত্রে প্রচারিত হচ্ছে, তার কোনো সরকারি বা আদালত-স্বীকৃত নথি এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে এসব দাবির স্বাধীন ও আনুষ্ঠানিক সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
সব মিলিয়ে একসময় জেলার তরুণ রাজনীতিতে আলোচিত নাম খাইরুল ইসলাম সজীব এখন দলীয় বহিষ্কার, বিতর্ক এবং দেশত্যাগের খবরের কারণে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটিই এখন স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে।

