নারায়ণগঞ্জে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত-সমালোচিত নাম মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান। বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নানা ইস্যুতে তার ভূমিকা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। একসময় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা শামীম ওসমানের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এবার দেওভোগের জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংকটে মহানগর বিএনপির আলোচিত নেতা জাকির খানের সঙ্গে তার প্রকাশ্য উপস্থিতি নতুন করে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অঙ্গনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
রোববার (৫ জুলাই) দেওভোগের জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম মাদ্রাসায় শিক্ষক মুফতি হারুন অর রশিদকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়াকে কেন্দ্র করে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মুফতি হারুন অর রশিদ হেফাজতে ইসলাম ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলা এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরা মসজিদ কমিটির সভাপতি হেদায়েতুল্লাহ, মোহাম্মদ মানিক, সাজ্জাদ দেওয়ানসহ কয়েকজন সদস্যকে মাদ্রাসার ভেতরে অবরুদ্ধ করে রাখে বলে অভিযোগ ওঠে। খবর পেয়ে স্থানীয় মুসল্লি ও এলাকাবাসী তাদের উদ্ধারের চেষ্টা করলে মাদ্রাসার সামনে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। একপর্যায়ে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী ও শত শত মুসল্লির উপস্থিতিতে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।
এমন পরিস্থিতিতে জাকির খানের গাড়িতে করে ঘটনাস্থলে আসেন মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান। পরে জাকির খান উপস্থিত জনতার উদ্দেশে বক্তব্য দেন এবং আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বৈঠকে প্রাথমিকভাবে তিন দিনের মধ্যে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের উপস্থিতিতে বিষয়টির চূড়ান্ত সমাধানে বসার সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে আলোচনার সমন্বয়কের দায়িত্বে জাকির খান থাকবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে যে, একসময় শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ফেরদাউসুর রহমান এখন নতুন রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলছেন।
এর আগে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীর সঙ্গে ফেরদাউসুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়। পরবর্তীতে সংগঠনের নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। একপর্যায়ে মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী ফেরদাউসুর রহমান ও তার অনুসারী কামাল উদ্দিন দায়েমীকে শোকজ নোটিশ প্রদান করেন।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ফেরদাউসুর রহমানের সঙ্গে শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা ছিল। বিভিন্ন ধর্মীয় কর্মসূচিতে ওসমান পরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্ক প্রকাশ্যে আসে।
২০২১ সালের ২০ মার্চ আলীরটেকের ডিক্রিরচর ঈদগাহ মাঠে আয়োজিত ইসলামী মহাসম্মেলনে তৎকালীন সংসদ সদস্য শামীম ওসমান প্রকাশ্যে ফেরদাউসুর রহমানকে নিজের “ছোট ভাই” বলে সম্বোধন করেছিলেন। সেই বক্তব্য স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এর আগে ২০১৬ সালে বন্দরের পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে লাঞ্ছনার ঘটনার পর যখন সেলিম ওসমান সমালোচনার মুখে পড়েন, তখন নারায়ণগঞ্জ জেলা হেফাজতের ব্যানারে আয়োজিত সমাবেশ থেকে শ্যামল কান্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছিল।
২০১৭ সালে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ এনে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বির বিরুদ্ধে আদালতে মামলাও করেন মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান।
এছাড়া ২০২১ সালে সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে তৎকালীন মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর বিরুদ্ধেও সমাবেশ করেন তিনি। ওই সমাবেশে দেওয়া তার বক্তব্য সে সময় ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল।
ধর্মীয় আন্দোলন, রাজনৈতিক ইস্যু এবং বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই নারায়ণগঞ্জের আলোচনায় রয়েছেন মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান। সর্বশেষ দেওভোগ মাদ্রাসা সংকটে জাকির খানের সঙ্গে তার প্রকাশ্য উপস্থিতি সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

