ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ নারায়ণগঞ্জে করোনাভাইরাস মহামারির ভয়াবহ সময়ে যখন মানুষ আক্রান্ত স্বজনের পাশে দাঁড়াতে ভয় পাচ্ছিল, এমনকি অনেক পরিবার করোনা আক্রান্ত বা মৃত ব্যক্তিকে গ্রহণ করতেও দ্বিধাগ্রস্ত ছিল, তখন সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গড়ে তোলেন ‘টিম খোরশেদ’, যা পরবর্তীতে দেশের অন্যতম আলোচিত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে পরিণত হয়। সেই ধারা এখনও অব্যাহত রেখেছেন সাবেক কাউন্সিলর ও সমাজসেবক মাকুসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ । সম্প্রতি নতুন করে বিনামূল্যে অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু করে আবারও আলোচনায় এসেছেন তিনি।
২০২০ সালে নারায়ণগঞ্জ করোনার অন্যতম হটস্পট হিসেবে পরিচিতি পায়। সেই সময়ে খোরশেদের নেতৃত্বে টিম খোরশেদ আক্রান্ত রোগীদের পাশে দাঁড়ায়। তারা করোনা রোগীদের হাসপাতালে নেওয়া, অক্সিজেন সরবরাহ, জরুরি চিকিৎসা সহায়তা এবং মৃত ব্যক্তিদের দাফন-সৎকারের মতো কঠিন দায়িত্ব পালন করে। যখন অনেকেই করোনা রোগীর কাছে যেতে ভয় পেতেন, তখন টিম খোরশেদ দিন-রাত কাজ করে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করে।
করোনা পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি ছিল অ্যাম্বুলেন্স। রোগীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অ্যাম্বুলেন্স পেতেন না। এ অবস্থায় খোরশেদের উদ্যোগে করোনা রোগী ও মৃতদেহ পরিবহনের জন্য বিনামূল্যে অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু করা হয়। এই সেবা অসংখ্য পরিবারকে সংকটময় সময়ে সহায়তা করেছে।
সম্প্রতি টিম খোরশেদ স্বল্প ব্যয়ে তৈরি ব্যাটারিচালিত অ্যাম্বুলেন্স প্রকল্পও চালু করেছে, যা সাধারণ মানুষের চিকিৎসা পরিবহনকে আরও সহজলভ্য করার লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এই উদ্যোগকে অনেকেই দেশের জন্য একটি রোল মডেল হিসেবে দেখছেন।
করোনা রোগীদের জন্য অক্সিজেন ছিল জীবনরক্ষাকারী উপকরণ। টিম খোরশেদ শত শত রোগীর কাছে বিনামূল্যে অক্সিজেন সিলিন্ডার পৌঁছে দেয়। একই সঙ্গে প্লাজমা সংগ্রহ ও সরবরাহ কার্যক্রম পরিচালনা করে অসংখ্য রোগীর চিকিৎসায় সহায়তা করে।
লকডাউন ও চিকিৎসক সংকটের সময়ে টেলিমেডিসিন সেবা চালু করে টিম খোরশেদ। ফোনের মাধ্যমে চিকিৎসা পরামর্শ গ্রহণের সুযোগ পেয়ে উপকৃত হন হাজারো মানুষ। পরবর্তীতে ডেঙ্গু ও তাপপ্রবাহকালেও এই টেলিমেডিসিন কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়।
করোনাকালে সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগ ছিল করোনা আক্রান্ত মৃত ব্যক্তিদের দাফন ও সৎকার। পরিবারের সদস্যরা যখন অনেক ক্ষেত্রে মৃতদেহ গ্রহণে অনাগ্রহী ছিলেন, তখন টিম খোরশেদ ধর্মীয় বিধান মেনে মরদেহ দাফন ও সৎকারের দায়িত্ব পালন করে। এই মানবিক কাজ দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসা পায়।
করোনা শুধু স্বাস্থ্য সংকটই নয়, অর্থনৈতিক সংকটও সৃষ্টি করেছিল। টিম খোরশেদ অসহায় ও নিম্নআয়ের মানুষের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ, কর্মসংস্থান সহায়তা এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করে।
করোনা মহামারিতে অসামান্য মানবিক অবদানের জন্য ২০২২ সালে ‘টিম খোরশেদ’ এশিয়া বুক অব রেকর্ডসের স্বীকৃতি অর্জন করে। করোনা যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ, দাফন-সৎকার, অক্সিজেন, প্লাজমা, অ্যাম্বুলেন্স, টেলিমেডিসিন এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের জন্য এই সম্মাননা প্রদান করা হয়।
করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরও থেমে থাকেনি টিম খোরশেদ। তীব্র তাপপ্রবাহে শহরের বিভিন্ন স্থানে বিশুদ্ধ পানি বিতরণ, বিনামূল্যে চিকিৎসা পরামর্শ, ডেঙ্গু সচেতনতা এবং বিভিন্ন সামাজিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করছে সংগঠনটি। প্রতিদিন হাজারো মানুষের কাছে বিশুদ্ধ পানি পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগও ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।
সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু করেছেন খোরশেদ আলম। নতুন এ উদ্যোগের মাধ্যমে জেলার যে কোনো প্রান্তের অসুস্থ ও অসহায় মানুষ জরুরি প্রয়োজনে বিনামূল্যে অ্যাম্বুলেন্স সুবিধা পাচ্ছেন।
সেবাটির উদ্বোধনকালে খোরশেদ বলেন, মানুষের ভালোবাসাই তাকে কাজ করার অনুপ্রেরণা দেয়। করোনাকালে যেভাবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, ভবিষ্যতেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চান। তিনি জানান, অনেক দরিদ্র পরিবার অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া বহন করতে পারে না। তাই মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে এ সেবা চালু করা হয়েছে।
ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে প্রশংসিত হচ্ছেন খোরশেদ। অনেকেই মনে করছেন, বর্তমান সময়ে চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এমন উদ্যোগ সাধারণ মানুষের জন্য বড় সহায়তা হিসেবে কাজ করবে। নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষ হলেও মানুষের সেবায় খোরশেদের সক্রিয় উপস্থিতি তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
করোনাকালে নারায়ণগঞ্জের মানুষের কাছে মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ শুধু একজন জনপ্রতিনিধি ছিলেন না তিনি হয়ে উঠেছিলেন ভরসার নাম। ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স, অক্সিজেন সেবা, প্লাজমা সহায়তা, টেলিমেডিসিন, দাফন-সৎকার, খাদ্য সহায়তা এবং পরবর্তী সময়ে নানা মানবিক উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি ‘করোনা বীর’ বা ‘করোনা হিরো’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। মহামারির অন্ধকার সময়ে মানবতার যে দৃষ্টান্ত তিনি ও তার টিম স্থাপন করেছেন, তা নারায়ণগঞ্জের ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

