ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ আমেরিকার সাথে দেশের স্বার্থবিরোধী অসম বাণিজ্য চুক্তি অবিলম্বে বাতিল করার দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখা। সোমবার (৩০ মার্চ) বিকেল ৪ টায় নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশ করা হয়েছে। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সিপিবি জেলা কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা শিবনাথ চক্রবর্তী, সাবেক সভাপতি হাফিজুল ইসলাম, জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক এম এ শাহীন, সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য বিমল কান্তি দাস, জেলা কমিটির সদস্য দুলাল সাহা ও ইকবাল হোসেন প্রমুখ।
সমাবেশে নেতৃবৃন্দ বলেন, একটি সত্যিকারের পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি দুটি পক্ষের মধ্যে সমতা নিশ্চিত করে। কিন্তু গত ৯ ফেব্রুয়ারি আমেরিকার সাথে স্বাক্ষরিত দেশের বাণিজ্যচুক্তিতে সমতার ছিটেফোঁটাও নেই। এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে মার্কিন ৬,৭১০টি পণ্যে শুল্ক ছাড় দিতে হবে, যেখানে বাংলাদেশ পাবে মাত্র ১,৬৩৮টি পণ্যে সুবিধা। সিপিডি’র হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশ বার্ষিক ১,৩২৭ কোটি টাকার আমদানি-শুল্ক রাজস্ব হারাবে। বিনিময়ে যে ‘সুবিধা’ দেওয়া হয়েছে তা নেহাতই নামমাত্র। এই চুক্তি বাংলাদেশকে আন্তর্জতিক বাজার থেকে সস্তায় পণ্য কেনার স্বাধীনতা হরণ করে মার্কিন পণ্য বেশি দামে কিনতে বাধ্য করবে। গম, তুলা, রাসায়নিক ও শিল্প পণ্য, এলএনজি, প্রতিরক্ষা সামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্য সামগ্রী মার্কিনীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত মূল্য দিয়ে কিনতে হবে।
নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগ মুহূর্তে গত ৯ ফেব্রুয়ারি মার্কিন বোয়িং কোম্পানির কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। যার প্রাথমিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩.৭ বিলিয়ন ডলার- বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৫ হাজার থেকে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এই চুক্তির অর্থ বাংলাদেশকে ১০ থেকে ২০ বছর ধরে প্রতি বছর ১,৫০০ থেকে ২,০০০ কোটি টাকা কিস্তি দিতে হবে- যা জনগণের উপর অন্যায় আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দেবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন সব কিছু ঠিক থাকলে ১৪টির মধ্যে প্রথম বিমানটি আসবে ২০৩১ সালের অক্টোবরের পর। উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া এভাবে হাজার হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় চুক্তি করা আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।
তারা আরও বলেন, এই চুক্তি শুধু বাণিজ্যিক নয়, এটি একটি কৌশলগত অধীনতার দলিল। চুক্তির ৪.১ ধারায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি জাতীয় নিরাপত্তার কারণে কোনো দেশের বিরুদ্ধে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা বা শুল্ক আরোপ করে, তাহলে বাংলাদেশকে ‘পরিপূরক বিধিনিষেধ’ গ্রহণ করতে হবে। এর অর্থ হলো, আমেরিকা চীন বা রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিলে বাংলাদেশকেও তাতে যোগ দিতে বাধ্য করা যাবে—বাংলাদেশের নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির সরাসরি লঙ্ঘন। এছাড়া চুক্তির ৫.২ ধারায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এমন কোনো ডিজিটাল বাণিজ্য চুক্তি করতে পারবে না যা মার্কিন স্বার্থকে ক্ষুণ্ণ করে। ৪.৩(৪) ধারায় বলা আছে, বাংলাদেশ যদি চীন বা রাশিয়ার সাথে কোনো মুক্তবাণিজ্য চুক্তি করে যা এই চুক্তির সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি বাতিল করে পুনরায় দণ্ডমূলক শুল্ক আরোপ করতে পারবে। এর মানে হলো বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি এখন ওয়াশিংটনের ভেটো-ক্ষমতার অধীনে চলে যাবে।
এই ধ্বংসাত্মক চুক্তির নেপথ্যে ছিলেন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান। চুক্তি সম্পাদনে তাঁর ভূমিকা ছিল সবচেয়ে সক্রিয় ও তৎপর। এই একই ব্যক্তিকে বিএনপি সরকার তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে—এটি জনগণের সাথে একটি নিষ্ঠুর প্রহসন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার পর খলিলুর রহমান নির্লজ্জভাবে ঘোষণা দিয়েছেন—’এটি খুব ভালো চুক্তি’ এবং ‘দেশের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে চুক্তি হয়নি।’ তিনি আরও দাবি করেছেন যে, নির্বাচনের আগে বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে কথা বলেই এই চুক্তি করা হয়েছে অর্থাৎ বিএনপি ও জামায়াত এই দেশবিক্রির বিষয়ে ‘সম্মতি’ দিয়েছিল। তাই বিএনপি সরকারকে অবিলম্বে এই চুক্তি বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে।
নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, বিএনপি-জামাতের শীর্ষ নেতাদের সাথে মার্কিন প্রতিনিধির ‘কথা বলা’ মানে জনগণের সম্মতি নয়। সাংবিধানিক নীতি অনুযায়ী, দেশের সার্বভৌমত্ব সংক্রান্ত যেকোনো চুক্তি সংসদে অনুমোদিত হতে হয় এই চুক্তিতে তা হয়নি। দেশের স্বার্থবিরোধী এই বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনে জড়িতদের বিচার ও অবিলম্বে চুক্তি বাতিল করতে হবে। এছাড়া এ অসম চুক্তি বহাল রেখে বিএনপি সরকার যদি মার্কিন মনিবদের সন্তুষ্ট রাখার নীতিতে চলে তাহলে দেশব্যাপী তীব্র গণ-আন্দোলন গড়ে তোলার হুঁশিয়ারি দেন নেতৃবৃন্দ।

