ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ বসন্তের উতলা বাতাসমাখা দিনে প্রেমিক-প্রেমিকারা ঘুরে বেড়িয়েছে একে অপরের হাত ধরে। তাদের সঙ্গী হয়ে পথ পরিভ্রমণ করেছে গোলাপ গুচ্ছ। শহরের নানা প্রান্তে দেখা মিলেছে প্রেমময়তার সুমধুর দৃশ্য। যদিও দিনক্ষণ বেঁধে হয় না ভালোবাসা। প্রকৃতির নিয়মে সহজাতভাবে হৃদয়ে জাগে ভালোবাসা। তবে হৃদয়ের ভাষা প্রকাশের বিশেষ কোনো দিন থাকলে ক্ষতি কি? ভালোবাসার জন্য নির্দিষ্ট কোনো দিন থাকলে হয়তো সেদিন বেড়ে যায় প্রেমের উত্তাপ। শনিবার ভালোবাসা দিবসে চোখে পড়েছে সুন্দরের প্রতীকী সেই উত্তাপ।
দিবসনির্ভর আনুষ্ঠানিকতা না থাকলেও ভালোবাসার দৃশ্যকাব্যে সজীব হয়েছে কংক্রিটের শহর ঢাকা। শাহবাগের পুষ্পবিতানের সামনে থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে টিএসসি, চারুকলা অনুষদ, বৃক্ষরাজিশোভিত রমনা পার্ক, ধানমন্ডি লেকসহ নগরের নানা প্রান্তে দিনভর ছড়িয়েছিল প্রেমের রং। গোলাপের পাশাপাশি শুভেচ্ছা কার্ডসহ নানা উপহার আদান-প্রদানে হয়েছে ভাব বিনিময়। ডিজিটাল দুনিয়ায় অনেকেই আবার সময়ের অভাবে ভালোবাসা প্রকাশে বেছে নেয় ক্ষুদে বার্তা, ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। ফাগুনের ভরদুপুরে রমনার সবুজ ঘাসে পা ডুবিয়ে চলছিল এক প্রেমিকযুগলের ভাব-বিনিময়। দুজনের চোখের ভাষায় ছিল ভালোবাসার প্রগাঢ় আহ্বান।
মুখে ছিল প্রণয়ের সংলাপ। পরিচয়টি পেশ করে জানতে চাই তাদের প্রেমের কথা। অনিন্দ্য ও প্রীতি নামের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এই জুটির কাছে ভালোবাসার ব্যাখা যেন দার্শনিকের মতো। চমৎকার করে নিজেদের ভাষ্য তুলে ধরা সেই কথাগুলো ছিল এরকমÑ আমাদের কাছে প্রেম একটি শিল্প, একটি দর্শন, একটি বিজ্ঞান এবং জীবের বেঁচে থাকার অন্যতম আকর্ষণ। দুনিয়ায় বিপরীত লিঙ্গ না থাকলে জীবনটা হয়ে উঠতো কষ্টকর ও অপরিপূর্ণ। হয়তো অনেকে বাঁচতেই চাইতো না। প্রেম জীবনকে করে তোলে বর্ণিল, বহুমাত্রিক ও পরিপূর্ণ। সে কারণেই জীবনে প্রেম ভালোবাসার গুরুত্ব বেঁচে থাকার অন্যতম উপজীব্য।
এই প্রেমিকযুগলের কথামতোই ভালোবাসা ছাড়া পূর্ণতা পায় না মানবজীবন। অপরিপূর্ণ সে জীবন হয়ে ওঠে বিবর্ণ। ভালোবাসার প্রাপ্তি বা পরিচর্যায় জীবন হয় সুন্দর ও সার্থক। সৃষ্টির অনাবিল আনন্দে সমান্তরাল পথে এগিয়ে চলে জীবন ও ভালোবাসা। পারস্পরিক মমতার বন্ধনে হয়ে ওঠে একে-অপরের আশ্রয়। সেই বন্ধন অটুট রাখার প্রচেষ্টায় নীরার বাগান কবিতায় কবি বলে যায়Ñ যতো না এঁটেল মাটি তার চেয়ে বেশি ছিল বালি/এই বালির ভিতরে ধীরে-ধীরে জীবনের ফুলকে ফোটানো/কাজটা সহজ ছিল না মোটেও/তার জন্য শ্রম চাই, চাই নিষ্ঠা, চাই ভালোবাসা/চাই প্রয়োজনমতো জল-হাওয়া …।
রাগ-অনুরাগে হৃদয়ের সেই নিভৃত অনুভবের সন্ধানে বিশ্বকবির উচ্চারণটি এমনÑ সখী, ভাবনা কাহারে বলে/সখী, যাতনা কাহারে বলে/তোমরা যে বল দিবস-রজনী ভালোবাসা ভালোবাসাÑসখী, ভালোবাসা কারে কয়…। সুরের আশ্রয়ে এভাবেই মনের গহীনে আলোড়ন তোলা বিচিত্র এ অনুভবকে উপলব্ধির চেষ্টা করেছেন অনেকেই। সেই সূত্রে গল্প-কবিতা-উপন্যাস কিংবা গানের বাণীতে অজস্রবার উচ্চারিত হয়েছে হৃদয়ঘটিত সে বোধের কথা।
নবীন বসন্ত দিনে নগরজুড়ে প্রকাশ্যে বা একান্তে প্রকাশিত হয়েছে প্রেমের সেই বার্তা। এদিন ছিল বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। ইতিহাসের পাতায় সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’স ডে। রাজধানী ঢাকার পথে পথে চোখে পড়েছে দিবসটি উদ্্যাপনের সুন্দরতম দৃশ্যকল্প। প্রেমিকযুগলরা নতুন করে বলেছে অনাদিকালের পুরনো সেই কথা ‘ভালোবাসি তোমায়’। অথবা কাব্যিক ঢংয়ে বলার ধরনটি ছিল এমনÑ ভেবেছিলেম আজকে সকাল হলে/সেই কথাটি তোমায় যাব বলে/ফুলের উদাস সুবাস বেড়ায় ঘুরে/পাখির গানে আকাশ গেল পুড়ে…।
এদিন দখিনা হাওয়ামাখা বসন্তে লাল গোলাপগুলো যেন ঘুরে বেড়িয়েছে দ্রুতগামী এই নগরে। তবে গোলাপগুলো নিজেরা পায়ে হেঁটে শহর পরিভ্রমণ করেনি। কোনো ফুলচাষির বাগান হয়ে পুষ্পবিতান ঘুরে প্রথমে উঠে এসেছে প্রেমের উদ্্যাপনে মশগুল প্রিয়তমদের হাতে। এরপর ভালোবাসার নিবেদন হয়ে ঠাঁই পেয়েছে প্রিয়তমাদের হাতের মুঠোয়। ভালোবাসা প্রকাশের সে ফুলগুলো বসন্ত বিলাসের স্মারক এঁকে লাল বসনা প্রেয়সীদের সঙ্গী হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে নগরের পথে-প্রান্তে।
নানা দিবসের মতোই বিশেষ দিনটির সূত্র ধরে যেন একটু বেশি উচ্চারিত হয়েছে ভালোবাসার কথা। অথবা বিশেষ দিবসের সুযোগে এদিনই প্রকাশিত হয়েছে প্রিয়তম কিংবা প্রিয়তমাকে মনের কথা জানান দেওয়ার সুপ্ত বাসনাটি। দিবসটি আবাহনে প্রেমিক-প্রেমিকারা ভালবাসাবাসিতে পার করেছে সকাল থেকে রাত। ব্যক্ত হয়েছে বাকি জীবনে পাশে থাকার প্রত্যয়। প্রিয়জনের পাশাপাশি এদিন পরিবারের আপনজন বা প্রিয় বন্ধুটিকেও জানানো হয়েছে তার প্রতি মমত্ব বা মনের গভীরতম টানের কথাটি। ভালোবাসা দিবসে শাহবাগের পুষ্প বিতানগুলোয় ছিল প্রেমরসিকদের জমজমাট আনাগোনা। ফুলটি কিনে প্রিয়জনের হাতে তুলে দিয়ে একে অপরকে জানিয়েছে ফুলেল শুভেচ্ছা।
বসন্তের দোলা লাগা ফাগুনের রংমাখা পোশাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারপাশের দেখা মিলেছে কপোত-কপোতীদের। অধিকাংশ মেয়েদের সাজসজ্জায় লালরঙা শাড়ির সঙ্গে খোঁপায় জুড়ে গেছে রকমারি ফুল। কারও বা মাথায় চড়ে বসেছিল গোলাপ, গাঁদা, গ্ল্যাডিওলাসে গড়া ফুলের টায়রা। বাহারি পোশাক আর বসন্ত বাতাসের ছোঁয়ায় উৎফুল্ল মননে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার চারপাশের চওড়া সড়কের পাশে নিভৃতে গল্প করে কেটেছে অসংখ্য প্রেমিক-প্রেমিকার সুসময়। দিনমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বা রমনা পার্কে সুন্দর সময় কাটিয়েও ঘটেছে প্রেমের উদ্্যাপন।
বসন্তের মাতাল সমীরণে ভালোবাসা দিবসে পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিল অনেক প্রেমিকযুগল। হৃদয়ঘটিত গভীর উচ্ছ্বাস ধারণ করে তারা চষে বেড়িয়েছে শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। অন্তর উজাড় করে বলেছে আগামী দিনের প্রেম-পথে চলার কথা। সেসব প্রেমিক-প্রেমিকার অন্তরের স্পন্দিত আবেগেই উদ্্যাপিত হয়েছে ভালোবাসা দিবস।
দিনটি যে ছিল শুধুই ভালোবাসার। ‘নিভৃতে যতনে মনের মন্দিরে’ প্রিয়জনকে আরাধনার দিন। সম্পর্কের বন্ধনকে জোরালো করার এক অনন্য ক্ষণ। জোড়ায় জোড়ায় প্রেমিকযুগল অনাবিল আনন্দে ঘুরে বেরিয়েছে রাজধানীর নানা আঙিনায়। যানজটের শহরে ক্রিংক্রিং শব্দ তোলা তিন চাকার রিকশায় চেপে কেউ বা কাটিয়েছে মধুর সময়। নির্ঝঞ্জাট রেস্তোরাঁয় বসে আনন্দময় আহারের সঙ্গে চলেছে ভাব বিনিময়। নগরের বিভিন্ন কফি হাউস থেকে শুরু করে রাস্তার ধারের চায়ের দোকানে বসেও হয়েছে প্রেম বিনিময়। ভালোলাগার মানুষের প্রতি মুগ্ধতার প্রকাশে বলা হয়েছে ‘আমার পরাণ যাহা চায়, তুমি তাই তুমি তাই গো’। পরস্পরের মুখোমুখি হয়ে রেস্তোরাঁয় বসে মজা করে খাওয়া, প্রফুল্ল মনটাকে প্রসারিত করে সবুজে আবৃত উদ্যানে ঘুরে বেড়ানো, শাহবাগ থেকে প্রিয়জনের হাতে ফুল কিংবা প্রেমের বাণীযুক্ত কার্ড উপহার দেওয়াÑএমন নানা অনুষঙ্গের মাঝে পরিলক্ষিত হয়েছে ভালোবাসা দিবসে প্রেমের উত্তাপ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বর থেকে ক্যাম্পাসের আশপাশের রেস্তোরাঁ-ক্যাফেতে দিনভর ছিল প্রেমিক-প্রেমিকার আনাগোনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, চারুকলা অনুষদ ছাড়াও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ধানমন্ডি লেক, চন্দ্রিমা উদ্যান, রমনা পার্কস নানা স্থানে যুগলদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। দেখা গেছে শহুরে নর-নারীর ভালোবাসার দৃশ্যকাব্য। লাল গোলাপসহ সুগন্ধিময় রকমারি ফুল দিয়ে প্রিয়জনকে বলা হয়েছে হƒদয়ে চাপা থাকা অব্যক্ত কথাটি।

