জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের ৩৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ৩১ অক্টোবর হলেও নারায়ণগঞ্জে তা পালিত হয়েছে রবিবার (১ নভেম্বর)। কেক কাটার মধ্য দিয়ে দিবসটি উদযাপন করা হয়। নারায়ণগঞ্জ আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট শাখাওয়াত হোসেন কেক কেটে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। তবে দিবসটি ঘিরে বড় কোনো আয়োজন কিংবা উল্লেখযোগ্য সাংগঠনিক কর্মসূচি দেখা যায়নি।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে নারায়ণগঞ্জ জেলা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সাংগঠনিক স্থবিরতা। দেড় বছরের বেশি সময় ধরে আহ্বায়ক কমিটি দায়িত্ব পালন করলেও এখনো সম্মেলনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আইনজীবী সমিতিতে সাম্প্রতিক সংঘর্ষের ঘটনায় সংগঠনটির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন এবং যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শামছুন নুর বাঁধনের পদত্যাগ। সব মিলিয়ে সংগঠনটির নেতৃত্ব ও কার্যক্রম নিয়ে আইনজীবীদের মধ্যে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন ও মহাসচিব ব্যারিস্টার কায়সার কামালের স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। কমিটিতে অ্যাডভোকেট মো. জাকির হোসেনকে আহ্বায়ক, অ্যাডভোকেট বেনজির আহমেদকে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এবং অ্যাডভোকেট কাজী আব্দুল গাফফারকে সদস্যসচিব করা হয়।
এ ছাড়া যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে রাখা হয় অ্যাডভোকেট জহিরুল হক, অ্যাডভোকেট মেহেবুব আরেফিন শিমু, অ্যাডভোকেট কারসার আলম চৌধুরী টুটুল, অ্যাডভোকেট আসমা বিথি ও অ্যাডভোকেট শামছুন নুর বাঁধনকে।
কমিটি ঘোষণার সময় তিন মাসের মধ্যে সম্মেলনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও সম্মেলনের উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি। ফলে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন, সংগঠনের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করা এবং আইনজীবীদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো কার্যত অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
এদিকে গত ৬ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতিতে দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা আদালতপাড়ায় উত্তেজনা সৃষ্টি করে। ঘটনাটি নিয়ে আইনজীবীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা হলেও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের পক্ষ থেকে বিরোধ নিরসনে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সাধারণ আইনজীবীদের অনেকের প্রত্যাশা, পেশাজীবীদের মধ্যে বিরোধ কিংবা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো মধ্যস্থতা ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেবে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনার পর ফোরামের অবস্থান, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে কী পরিকল্পনা রয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো উদ্যোগ সামনে আসেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর মধ্যে যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শামছুন নুর বাঁধনের পদত্যাগের বিষয়টিও সংগঠনটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিন সম্মেলন না হওয়া, সাংগঠনিক কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতা এবং নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে তাঁর পদত্যাগকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন আইনজীবীদের একাংশ।
আদালতপাড়া সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নারায়ণগঞ্জ জেলা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে পুরোনো কমিটি বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক আইনজীবী মো. জিয়াউর রহমানের স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে আগের কমিটি বাতিল করা হয়।
এরপর একই বছরের ২৭ মার্চ নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। নতুন কমিটি ঘোষণার পর আদালতপাড়ায় সম্মেলন ও নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী কয়েকজন আইনজীবী নিজেদের অবস্থান জানান দিতে শুরু করেন। নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে একাধিক বলয়ও তৈরি হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য। তবে দীর্ঘ সময়েও সম্মেলন না হওয়ায় সেই আলোচনা অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়েছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২০ সালের ৯ ডিসেম্বর। ওই সম্মেলনে দুটি প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। একটি প্যানেলে সভাপতি পদে অ্যাডভোকেট আব্দুল হামিদ ভাসানী, সাধারণ সম্পাদক পদে অ্যাডভোকেট আজিজ আল মামুন, সহসভাপতি পদে অ্যাডভোকেট সীমা সিদ্দিকী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান এবং সাংগঠনিক সম্পাদক পদে অ্যাডভোকেট আলী হোসাইন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
অন্য প্যানেলে সভাপতি পদে অ্যাডভোকেট সরকার হুমায়ুন কবির, সাধারণ সম্পাদক পদে অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকির, সহসভাপতি পদে অ্যাডভোকেট আজিজুল হক হান্টু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে অ্যাডভোকেট আনোয়ার প্রধান এবং সাংগঠনিক সম্পাদক পদে অ্যাডভোকেট একেএম ওমর ফারুক নয়ন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ওই সম্মেলনে দ্বিতীয় প্যানেল জয়লাভ করে।
পরবর্তী সময়ে ২০২২ সালের ১৬ নভেম্বর কেন্দ্রীয় কমিটি নারায়ণগঞ্জ জেলা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের ১২৫ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটির অনুমোদন দেয়। ওই কমিটিতে ২০২০ সালের সম্মেলনে নির্বাচিত পাঁচজনকে তাঁদের স্ব স্ব পদে বহাল রাখা হয়।
তবে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের একাংশের অভিযোগ, ওই কমিটির সময়েও সংগঠনকে প্রত্যাশিত মাত্রায় সক্রিয় করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে পুরোনো কমিটি বাতিল করে নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হলেও সম্মেলনের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি। এতে সাংগঠনিক পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম এখন তিনটি বড় প্রশ্নের মুখে—দেড় বছরের বেশি সময়েও সম্মেলন না হওয়া, আইনজীবী সমিতিতে সাম্প্রতিক সংঘর্ষের পর সংগঠনটির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন এবং যুগ্ম আহ্বায়কের পদত্যাগ।
একটি রাজনৈতিক আদর্শভিত্তিক পেশাজীবী সংগঠনের কার্যকারিতা কেবল কমিটি গঠন কিংবা প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। আইনজীবীদের পেশাগত স্বার্থ রক্ষা, পারস্পরিক বিরোধ নিরসন, সাংগঠনিক ঐক্য বজায় রাখা এবং আদালতপাড়ায় পেশাগত পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখাও সংগঠনটির দায়িত্বের অংশ।
এ অবস্থায় নারায়ণগঞ্জের আইনজীবীদের সামনে এখন বড় প্রশ্ন, দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে কবে অনুষ্ঠিত হবে সম্মেলন? নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে সংগঠনটি কি আবারও সক্রিয় হয়ে উঠবে, নাকি অনিশ্চয়তার মধ্যেই দীর্ঘায়িত হবে আহ্বায়ক কমিটির কার্যক্রম?

