দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও নানা জটিলতায় জর্জরিত নারায়ণগঞ্জ শহরকে একটি পরিকল্পিত ও সচল নগরীতে পরিণত করতে সময় ও ধৈর্যের প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালাম। একই সঙ্গে যানজট নিরসনে ট্রাফিক পুলিশ, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবক ও সাধারণ নাগরিকদের সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার (৫ অক্টোবর) সন্ধ্যায় নগরীর চাষাঢ়ায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে স্বেচ্ছাসেবকদের কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বিকেএমইএ, নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, মডেল গ্রুপ ও ‘উই আর ভলান্টিয়ার’-এর উদ্যোগে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
আবুল কালাম বলেন, নারায়ণগঞ্জ শহর দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। ফলে একদিনে এর সব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। পরিকল্পিতভাবে নগর ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হলে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধৈর্য ধরে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘এটি দীর্ঘদিনের জঞ্জালযুক্ত ও অপরিকল্পিত একটি শহর। এটিকে পরিকল্পনার মধ্যে নিয়ে আসার জন্য আমাদের একটু ধৈর্যশীল থাকতে হবে। ট্রাফিক বাহিনীরও সীমিত সামর্থ্য রয়েছে। সেই সামর্থ্য নিয়েই চাষাঢ়াকে যানজটমুক্ত রাখতে এবং যান চলাচল স্বাভাবিক করতে তারা আপ্রাণ চেষ্টা করছে।’
ট্রাফিক আইন মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে সংসদ সদস্য বলেন, আইন সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। জনপ্রতিনিধি বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য আলাদা কোনো সুবিধা থাকা উচিত নয়।
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমি দেখি, ট্রাফিক পুলিশ চেষ্টা করে আমার গাড়িটিকে রং সাইড দিয়ে পার করে দিতে। কিন্তু আমি তাদের বলি, না, রং সাইড দিয়ে যাওয়া যাবে না। আমি পাবলিকের মতোই যাব, সবার সঙ্গে একসঙ্গে যেতে হবে।’
যানজটের কারণে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি তিনিও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন উল্লেখ করে আবুল কালাম বলেন, ‘আমি নিজেও ভুক্তভোগী। ঢাকায় প্রবেশ করতে আমার দুই-তিন ঘণ্টা লাগে। নিশ্চয়ই আপনাদেরও লাগে। আমরা সবাই চাই স্বস্তিতে ও সচলভাবে চলাচল করতে।’
চাষাঢ়া এলাকার যানজট কমাতে অবকাঠামোগত বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, লিংক রোডের কাজ এখন দৃশ্যমান পর্যায়ে এসেছে। একই সঙ্গে রাইফেল ক্লাব ও এর সামনের সড়ককে যানজটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হিসেবে চিহ্নিত করে তা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রাইফেল ক্লাব এলাকার ট্যাক্সি স্ট্যান্ড প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ট্যাক্সি স্ট্যান্ডটি সমন্বয় ও পরিবর্তনের মাধ্যমে জায়গাটি আরও পরিচ্ছন্ন ও যান চলাচলের উপযোগী করার পরিকল্পনা রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনডিএ) ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে এ বিষয়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘এখানে যেহেতু আমাদের জিয়া হল হবে, স্বয়ংক্রিয়ভাবেই এই জায়গাটির গুরুত্ব আলাদাভাবে বেড়ে যাবে। আমি আশা করি, আপনাদের সবার পরিশ্রমের মাধ্যমে আমরা সফলতার দিকে এগিয়ে যাব।’
নাগরিকদের দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে আবুল কালাম বলেন, যানজটের ভোগান্তি যেমন সবাইকে পোহাতে হচ্ছে, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে যানজট তৈরির পেছনেও নাগরিকদের অসচেতনতা দায়ী। শুধু আইন প্রয়োগ করে এ সমস্যা পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়; এজন্য মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘আমরা যারা স্বস্তি পেতে চাই এবং যারা দুর্ভোগে ভুগছি—দুইটাই তো আমরা। এই পরিস্থিতি আমরাই তৈরি করছি। গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। কোনো আইন দিয়ে এটা পুরোপুরি করা সম্ভব নয়, এটা মনোবৃত্তির ব্যাপার।’
নারায়ণগঞ্জকে একটি সুন্দর ও পরিকল্পিত শহর হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করে দিয়েছেন। ফলে নগরীর সমস্যাগুলো এখন শুধু স্থানীয় পর্যায়ের বিষয় নয়, সর্বোচ্চ পর্যায়েও গুরুত্ব পাচ্ছে।
গত সাত মাসে নগরীর যানজটসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা, বৈঠক ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শদাতাদের মতামত নিয়ে কীভাবে সমস্যাগুলো সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে কাজ চলছে। তবে এখনো স্থায়ী সমাধানের পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
স্বেচ্ছাসেবকদের নতুন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে এমপি আবুল কালাম বলেন, ‘আজকের এই উদ্যোগের কারণ হলো, আমরা যেন চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারি। সেই লক্ষ্যে আমাদের স্বেচ্ছাসেবকেরা যেভাবে এগিয়ে আসছেন এবং সংগঠনগুলো যেভাবে এগিয়ে আসছে, তা প্রশংসনীয়।’
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান।
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান, নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনডিএ) চেয়ারম্যান মাশুকুল ইসলাম রাজীব, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সরকার হুমায়ুন কবির, বিকেএমইএর সহসভাপতি (অর্থ) মোরশেদ সারোয়ার সোহেল, আবুল কালামের রাজনৈতিক সচিব আবুল কাউছার আশা, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) সোহেল রানা, নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আফজাল হোসেন পন্টি, জেলা যুবদলের সদস্য সচিব মশিউর রহমান রনি, সদর মডেল থানার ওসি সাজেদুর রহমান, নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক সোহেল আক্তার সোহান এবং ‘উই আর ভলান্টিয়ার’-এর প্রতিষ্ঠাতা আহমেদুর রহমান তনুসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

