নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে ভিন্নধর্মী এক চিত্র ফুটে উঠছে। জেলার বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তি বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, পরিবহন খাতের দ্বন্দ্ব, আধিপত্য বিস্তার এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা চললেও, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিক ও জনসম্পৃক্ত কর্মসূচি বাড়িয়ে নিজেদের উপস্থিতি জোরালো করার চেষ্টা করছে। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে দুই দলের কর্মকাণ্ড নিয়ে ভিন্ন ধরনের মূল্যায়ন তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলের নেতাকর্মীরাই মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক চাপের মুখে ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দলই নতুনভাবে মাঠে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেলেও সাংগঠনিক কৌশলে দৃশ্যমান পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএনপির স্থানীয় অনেক নেতা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে আলোচনায় থাকলেও একই সময়ে দলটির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, পরিবহন নিয়ন্ত্রণ, হকার নিয়ন্ত্রণ এবং অভ্যন্তরীণ বিরোধের অভিযোগও সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় দলের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেক তৃণমূল নেতাকর্মীও। তাঁদের মতে, অভিযোগের বিষয়ে দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী গত কয়েক মাস ধরে নিয়মিত সাংগঠনিক সভা, মতবিনিময়, গণসংযোগ, সামাজিক সহায়তা কার্যক্রম, চিকিৎসাসেবা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে ধারাবাহিক কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্ত করার চেষ্টা করছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে জেলা ও মহানগর জামায়াতে ইসলামী মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে শহীদ ও আহত পরিবারের সঙ্গে মতবিনিময়, আলোচনা সভা, ডকুমেন্টারি প্রদর্শনী, গণমিছিল, গণসমাবেশ, দোয়া মাহফিল, সেমিনার এবং বিভিন্ন পর্যায়ে গণসংযোগ।
এছাড়া জেলার বিভিন্ন এলাকায় জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহত পরিবারের খোঁজখবর নেওয়া, আর্থিক সহযোগিতা এবং সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে দলটি। স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে জামায়াত জনসম্পৃক্ত রাজনীতির বার্তা দিতে চাইছে।
অপরদিকে বিএনপিকে বিব্রত করেছে একের পর এক বিতর্ক। সাম্প্রতিক সময়ে জেলার বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজির অভিযোগকে কেন্দ্র করে দলটির একাধিক নেতার নাম আলোচনায় আসে। পরিবহন খাত, বাজার, শিল্পাঞ্চল, ঘাট, ফুটপাত ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে। যদিও অভিযুক্ত অনেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
সম্প্রতি চাঁদাবাজির অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছেলে ও সাবেক যুবদল নেতা খাইরুল ইসলাম সজীবকে আটকের ঘটনা জেলাজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। পরে মুচলেকার মাধ্যমে তাঁর মুক্তি নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা হয়।
এছাড়া মৌমিতা পরিবহনকে ঘিরে চাঁদা দাবির অভিযোগ, পরিবহন মালিকদের বিরোধ এবং পরবর্তীতে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় সাধারণ যাত্রীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিএনপির একাধিক স্থানীয় নেতার নাম আলোচনায় আসে। একই সঙ্গে বন্দর, ফতুল্লা, রূপগঞ্জ, সোনারগাঁও ও আড়াইহাজারেও বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টদের মতে, নারায়ণগঞ্জে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জনআস্থা ধরে রাখা। একদিকে বিএনপিকে নিজেদের নেতাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ মোকাবিলা করে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ধারাবাহিক জনসম্পৃক্ত কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্ত করার চেষ্টা করছে।
এদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ইতোমধ্যে কর্মসূচি ঘোষণা করলেও বিএনপির পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জে বড় পরিসরের দৃশ্যমান কর্মসূচি নিয়ে তেমন কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। বিপরীতে জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোট বিভিন্ন সমাবেশ, গণমিছিল ও গণসংযোগ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের অভিমত, আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে। এই পরিস্থিতিতে জনমুখী কর্মসূচি, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং নেতাকর্মীদের আচরণ—এই তিনটি বিষয়ই ভোটারদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ফলে বিতর্ক থেকে বেরিয়ে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং জনসম্পৃক্ত রাজনীতিতে কে কতটা সফল হয়, সেটিই আগামী দিনের রাজনীতির অন্যতম নির্ধারক হিসেবে বিবেচিত হবে।
ব্যাকফুটে বিএনপি, মাঠে সক্রিয় জামায়াত: নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে পাল্টাচ্ছে আলোচনার কেন্দ্র
Leave a Comment

