নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির অভিযোগ দিন দিন আরও জোরালো হচ্ছে। একই দলের দুই শীর্ষ নেতা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শাখাওয়াত হোসেন খান এবং সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু সাম্প্রতিক সময়ে পৃথকভাবে কর্মসূচি পালন করায় দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভক্তির আলোচনা তীব্র হয়েছে। তাদের অনুসারীরাও আলাদা আলাদাভাবে সক্রিয় থাকায় মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক ঐক্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বিশেষ করে ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে ঘিরে সম্ভাব্য নাশকতা প্রতিরোধে মহানগর বিএনপির পক্ষ থেকে পৃথক দুটি কর্মসূচি পালিত হওয়ায় বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দলীয় নেতাকর্মীদের অনেকেই মনে করছেন, দুই শীর্ষ নেতার রাজনৈতিক অবস্থান ও কর্মসূচির ভিন্নতা মাঠপর্যায়ে বিভক্তির বার্তা দিচ্ছে।
দলীয় সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং বিভিন্ন স্থানে সমবেত হওয়ার চেষ্টা চালায়। পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিএনপির নেতাকর্মীরাও সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেন।
এরই অংশ হিসেবে ২২ জুন সন্ধ্যায় মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শাখাওয়াত হোসেন খানের নেতৃত্বে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সামনে থেকে “আওয়ামী লীগের সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিল” বের হয়। মিছিলটি শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে চাষাঢ়া শহীদ জিয়া হলের সামনে গিয়ে শেষ হয়। তবে ওই কর্মসূচিতে সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপুকে দেখা যায়নি। একই সঙ্গে শাখাওয়াত হোসেন খানের পাশে এমন কয়েকজন নেতাকে দেখা গেছে, যারা দীর্ঘদিন মহানগর বিএনপির কর্মসূচিতে খুব একটা সক্রিয় ছিলেন না। এ নিয়ে দলীয় অঙ্গনে নতুন একটি বলয় গড়ে ওঠার আলোচনা শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে, ২৩ জুন দুপুরে সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপুর নেতৃত্বেও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে পৃথক প্রতিবাদ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। ওই কর্মসূচিতে আবার আহ্বায়ক শাখাওয়াত হোসেন খান অনুপস্থিত ছিলেন। টিপুর নেতৃত্বাধীন কর্মসূচিতেও কয়েকজন নতুন মুখের উপস্থিতি নেতাকর্মীদের নজর কাড়ে। ফলে মহানগর বিএনপিতে দুই কেন্দ্রিক নেতৃত্বের বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে।
এর আগে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতাল পরিদর্শনের সময়ও দুই নেতার মধ্যে প্রকাশ্যে কথোপকথন দলীয় অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দেয়। হাসপাতাল পরিদর্শনে জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির, জেলা সিভিল সার্জন ডা. এ এফ এম মুশিউর রহমান, সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শাখাওয়াত হোসেন খান এবং সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু উপস্থিত ছিলেন।
সেখানে এক পর্যায়ে শাখাওয়াত হোসেন খান টিপুকে উদ্দেশ করে বলেন, “তুমি তো আওয়ামী লীগ নিয়েই ঘুরো, শামীম ওসমান, সেলিম ওসমান করো কেন?” জবাবে টিপুও নিজের অবস্থান তুলে ধরেন। যদিও পরে আর কোনো প্রকাশ্য বাকবিতণ্ডা হয়নি, তবে ঘটনাটি দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ৪১ সদস্যবিশিষ্ট নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করে। কমিটিতে অ্যাডভোকেট শাখাওয়াত হোসেন খানকে আহ্বায়ক এবং অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপুকে সদস্য সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
কমিটি ঘোষণার পর থেকে নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই তারা মহানগরের ওয়ার্ড, সাতটি ইউনিয়ন, বন্দর উপজেলা, বন্দর থানা এবং সদর থানা বিএনপির কমিটি গঠন সম্পন্ন করেন। এসব কমিটিতে কয়েকজন বিতর্কিত নেতার অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও দীর্ঘদিন পর সাংগঠনিক কাঠামো দাঁড় করাতে সক্ষম হওয়াকে অনেকে ইতিবাচক হিসেবেও দেখছেন।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে পৃথক কর্মসূচি, নতুন নতুন অনুসারীদের নিয়ে আলাদা বলয় তৈরি এবং প্রকাশ্যে মতবিরোধের ঘটনাগুলো মহানগর বিএনপির অভ্যন্তরীণ ঐক্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। দলীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশের মতে, নেতৃত্বের এই দূরত্ব দ্রুত নিরসন না হলে সাংগঠনিক কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

