নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) প্রশাসক হিসেবে ২০২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি নগরবাসীর বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। দায়িত্ব নেওয়ার দিনই তিনি নাগরিক সমস্যা সমাধানে ৬০ দিনের কর্মসূচির ঘোষণা দেন এবং নগরবাসীর সেবা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
গত কয়েক মাসে নগরীর উন্নয়ন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে তার সরব উপস্থিতি জনমনে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। সাধারণ নাগরিকদের অভিযোগ ও সমস্যার বিষয়ে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ সৃষ্টি, বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে মতবিনিময় সভা, নাগরিক সেবার মান উন্নয়নে উদ্যোগ গ্রহণ, খাল, জলাশয় ও পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বারোপ, বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশবান্ধব কার্যক্রম উৎসাহিত করা, নগরীর সৌন্দর্যবর্ধনে বিভিন্ন উদ্যোগ, সড়ক, ড্রেন ও জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের ওপর গুরুত্বারোপ, নগরীর দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শন ও তদারকি, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কর্মসূচিতে সম্পৃক্ততা।
বিশেষ করে মহিলা কলেজ থেকে ২ নম্বর রেলগেট পর্যন্ত বাইপাস সড়ক নির্মাণ উদ্যোগ, দীর্ঘদিনের অবহেলিত জিউস পুকুর পরিষ্কার, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে ওয়ার্ডভিত্তিক পরিচ্ছন্নতা অভিযান, স্কুলভিত্তিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং বিভিন্ন নাগরিক সমস্যার দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নগরবাসীর নজর কাড়ছে।
এ অবস্থায় নগরজুড়ে একটি প্রশ্ন আলোচনায় এসেছে সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর জনপ্রিয়তাকে কি ছাড়িয়ে যেতে পারবেন বিএনপি নেতা সাখাওয়াত হোসেন খান?
তবে শহরের ফুটপাত ও যানযট ও অবৈধ অটোরিকশা নিয়ে অনেকটাই সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে তাকে । শহরের হকার উচ্ছেদ করে সফলতা দেখাতে পারেনি তিনি পুনরায় শহরের হকার রাস্তা দখল করে দোকান বসিয়ে সাধারন মানুষের ভোগান্তির সৃষ্টি করছে।
অপর দিকে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে একটি প্রতিষ্ঠিত নাম। তিনি প্রথমে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর টানা তিনবার মেয়র নির্বাচিত হন। ২০১১, ২০১৬ ও ২০২২ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি বিরল রাজনৈতিক নজির স্থাপন করেন।
তার মেয়াদকালে যেসব কাজ সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়, তার মধ্যে রয়েছে—
নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন। জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রকল্প গ্রহণ। শহরের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা। কিল্লারপুল, দেওভোগ, চাষাঢ়া ও বিভিন্ন এলাকায় অবকাঠামো উন্নয়ন। নারী নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি লাভ। রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও স্বাধীন অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা।
তবে দীর্ঘ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করায় তার বিরুদ্ধে সমালোচনাও ছিল। বিশেষ করে জলাবদ্ধতা, যানজট, ফুটপাত দখল এবং কিছু উন্নয়ন প্রকল্পের ধীরগতির বিষয়ে নাগরিকদের একটি অংশ অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আইভীর জনপ্রিয়তা শুধু উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে নয়; দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্ক, সাংগঠনিক যোগাযোগ এবং জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততার ফলেও তৈরি হয়েছে।
সাখাওয়াত হোসেন খান যদি— চলমান উন্নয়ন কাজ দৃশ্যমানভাবে সম্পন্ন করতে পারেন, জলাবদ্ধতা ও যানজট সমস্যায় কার্যকর সমাধান দিতে পারেন, পরিচ্ছন্ন ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন নিশ্চিত করতে পারেন, নাগরিক সেবাকে আরও সহজ ও দ্রুত করতে পারেন, তাহলে তিনি অল্প সময়েই শক্তিশালী জনসমর্থন গড়ে তুলতে সক্ষম হতে পারেন।
বর্তমানে নগরবাসীর একটি অংশ মনে করছে, প্রশাসক হিসেবে সাখাওয়াত হোসেন খান শুরুতেই যে কর্মতৎপরতা দেখিয়েছেন তা আশাব্যঞ্জক। অন্যদিকে আইভীর তিন মেয়াদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এখনও বড় একটি বাস্তবতা।
চাষাঢ়া এলাকার ব্যবসায়ী আব্দুল করিম বলেন, “সাখাওয়াত হোসেন খান দায়িত্ব নেওয়ার পর শহরে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম আগের চেয়ে দৃশ্যমান হয়েছে। জিউস পুকুর পরিষ্কার, ডেঙ্গু প্রতিরোধে অভিযান এবং বাইপাস সড়কের মতো উদ্যোগ মানুষ ইতিবাচকভাবে দেখছে। তিনি যদি এ ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেন, তাহলে আইভীর জনপ্রিয়তাকেও চ্যালেঞ্জ জানাতে পারবেন।”
দেওভোগ এলাকার বাসিন্দা রাবেয়া খাতুন বলেন, “প্রশাসক হিসেবে তিনি অল্প সময়ের মধ্যে মাঠে নেমে কাজ করছেন। আগে অনেক সমস্যার কথা বললেও সমাধান হতো না। এখন অন্তত দ্রুত উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। তাই ভবিষ্যতে তিনি আরও জনপ্রিয় হবেন বলে মনে করি।”
নারায়ণগঞ্জ কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান বলেন, “সেলিনা হায়াৎ আইভী একদিনে জনপ্রিয় হননি। তিনি টানা তিনবার জনগণের ভোটে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। সড়ক, ড্রেনেজ, পরিচ্ছন্নতা ও নগর উন্নয়নে তার অবদান মানুষ সহজে ভুলবে না। কয়েক মাসের কাজ দিয়ে তার সঙ্গে তুলনা করা ঠিক হবে না।”
মাসদাইর এলাকার গৃহিণী শারমিন আক্তার বলেন, “আইভীর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ। সুখে-দুঃখে মানুষ তাকে পাশে পেয়েছে। সাখাওয়াত হোসেন খান ভালো কাজ করছেন, কিন্তু আইভীর জনপ্রিয়তার জায়গায় পৌঁছাতে হলে তাকে দীর্ঘ সময় ধরে জনগণের আস্থা ধরে রাখতে হবে।”
নগরবাসীর মতামত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এক পক্ষ সাখাওয়াত হোসেন খানের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে আশাবাদী। অন্যদিকে আরেক পক্ষ মনে করে, তিনবারের নির্বাচিত মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে তার জনপ্রিয়তাকে ছাড়িয়ে যাওয়া সহজ হবে না। ফলে এখনই চূড়ান্ত মূল্যায়নের সময় না এলেও নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে ‘আইভীকে ছাড়াতে পারবেন কি সাখাওয়াত?’— এই প্রশ্নটি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

