ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ নারায়ণগঞ্জে দীর্ঘদিন ধরে জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকায় সংগঠনটির কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। নেতৃত্বের অভাবে মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক তৎপরতা কমে যাওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে এক ধরনের শূন্যতা। আর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ ও যুবলীগ বিভিন্ন এলাকায় ঝটিকা মিছিল, পোস্টারিং ও বিক্ষোভ কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিএনপির ছাত্র রাজনীতির একাধিক সূত্র জানায়, জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের পাশাপাশি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিট, থানা, পৌরসভা, কলেজ, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটিগুলো বিলুপ্ত হওয়ার পর থেকে সংগঠনটির কার্যক্রম প্রায় থমকে যায়। এতে মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় দ্রুত সময়ের মধ্যে নতুন ও গ্রহণযোগ্য কমিটি ঘোষণার দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।
এদিকে নতুন কমিটি গঠনের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন ছাত্রনেতা নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে প্রচার-প্রচারণা ও কর্মী সমাবেশে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা এবং সাংগঠনিক উপস্থিতি দেখানোর প্রতিযোগিতাও বেড়েছে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন হিসেবে পরিচিত এবং বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ ওযুবলীগের সাবেক নেতাকর্মীরাও বিভিন্ন স্থানে আকস্মিক কর্মসূচি পালন করছে। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠদের প্ররোচনায় স্থানীয় সাবেক ছাত্রলীগ ওযুবলীগের নেতারা পুনরায় সংগঠনটিকে সক্রিয় করার চেষ্টা করছেন। বিভিন্ন কর্মসূচিতে অয়ন ওসমান ও আজমেরী ওসমানের নাম উল্লেখ করে ভবিষ্যতে তাদের আবির্ভাবেরও ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে।
রাজনৈতিক সূত্রে জানা যায়, বিগত সরকারের সময় আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকার কারণে নারায়ণগঞ্জে ছাত্রদলের অনেক নেতাকর্মী হামলা, মামলা ও নির্যাতনের শিকার হন। এতে সংগঠনটির সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে।
সর্বশেষ ২০২৩ সালের ২৬ জানুয়ারি নাহিদ হাসান ভূঁইয়াকে সভাপতি ও জুবায়ের রহমান জিকুকে সাধারণ সম্পাদক করে জেলা ছাত্রদলের ৯ সদস্যের আংশিক কমিটি এবং রাকিবুর রহমান সরকারকে সভাপতি ও রাহিদ ইশতিয়াক শিকদারকে সাধারণ সম্পাদক করে মহানগর ছাত্রদলের ৬ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল।
তবে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার আগেই শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠায় ২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। একইসঙ্গে অধীনস্থ সকল ইউনিট কমিটিও বাতিল ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকেই ছাত্রদলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসে।
এ অবস্থায় বিএনপি সরকারের মেয়াদে নারায়ণগঞ্জে দলীয় অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে দ্রুত ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠনের দাবি উঠেছে। তৃণমূল নেতাকর্মীরা বলছেন, যারা দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন এবং মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন, তাদের মূল্যায়নের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব গঠন করা প্রয়োজন। তাদের মতে, একটি গ্রহণযোগ্য ও ত্যাগীদের মূল্যায়ন করা কমিটি ছাত্ররাজনীতিতে নতুন গতি ফিরিয়ে আনতে পারে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের একের পর এক ঝটিকা মিছিল ও কর্মসূচি। বিভিন্ন সময়ে জেলার নানা এলাকায় এসব কর্মসূচি পালনের অভিযোগ উঠেছে।
১৫ মে ২০২৬ রূপগঞ্জের পূর্বাচল এলাকা সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করে ছাত্রলীগের সাবেক নেতাকর্মীদের একটি দল। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় সাবেক ওয়ার্ড ছাত্রলীগ নেতা মো. আব্দুল মামুনের নেতৃত্বে ২০ থেকে ৩০ জন এ কর্মসূচিতে অংশ নেয়।
১০ এপ্রিল ২০২৬ সিদ্ধিরগঞ্জের খান মার্কেট এলাকা বিক্ষোভ মিছিল করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। সেখানে জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সাফায়েত আলম সানীর নির্দেশনায় সানি আহমেদ পরশ নেতৃত্ব দেন বলে জানা যায়।
৫ নভেম্বর ২০২৫ শীতলক্ষ্যা সেতু সংলগ্ন এলাকা গভীর রাতে মশাল মিছিল বের করা হয়। মিছিলে শামীম ওসমান ও অয়ন ওসমানের ছবি ব্যবহার করা হয়।
৩১ অক্টোবর ২০২৫ ফতুল্লার রঘুনাথপুর এলাকা রাতের আঁধারে ৭০ থেকে ৮০ জন নেতাকর্মী মশাল মিছিল বের করে। পরে ছাত্রদল ও যুবদলের সাবেক নেতাকর্মীরা মিছিলটি প্রতিহত করলে কয়েকজনকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।
২১ এপ্রিল ২০২৫ সোনারগাঁ এলাকা মুখোশ পরিহিত একদল ব্যক্তি মিছিল বের করে এবং তার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়।
২১ মে চাষাঢ়া এলাকায় লাঠিসোঁটা নিয়ে যুবলীগের একটি ঝটিকা মিছিলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। খাজা সুপার মার্কেটের সামনে থেকে মিছিলটি শুরু হয়ে লিংক রোড এলাকায় গিয়ে শেষ হয় বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ-এর নামে নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে পোস্টারিংয়ের ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এরপর থেকেই সংগঠনটির নাম ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা কর্মসূচির ঘটনা সামনে আসছে।

