ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন প্রভাব বিস্তার করে আসা আলোচিত ওসমান পরিবার এখন চরম সংকটের মুখে। এক সময় জেলার রাজনীতি, প্রশাসন ও বিভিন্ন সামাজিক-অর্থনৈতিক খাতে যাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল, সেই পরিবারের সদস্যরা বর্তমানে দেশত্যাগ করে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, হামলা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে দায়ের হওয়া একাধিক মামলার বিচার কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে বহু বছর ধরে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত ছিলেন শামীম ওসমান, সেলিম ওসমান এবং প্রয়াত নাসিম ওসমান। তিন ভাই বিভিন্ন সময়ে নারায়ণগঞ্জের পৃথক আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তাদের রাজনৈতিক প্রভাব শুধু সংসদীয় রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না জেলার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় ক্ষমতার কেন্দ্রেও তাদের আধিপত্য ছিল দৃশ্যমান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওসমান পরিবারের নিয়ন্ত্রণে নারায়ণগঞ্জে একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে উঠেছিল। বিশেষ করে শামীম ওসমানের অনুসারীরা বিভিন্ন এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতেন। একই সঙ্গে পরিবারের নতুন প্রজন্মের সদস্য আজমেরী ওসমান ও অয়ন ওসমান নগরীর বিভিন্ন এলাকায় প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। স্থানীয়দের দাবি, তাদের সামনে প্রকাশ্যে কথা বলার সাহসও অনেকের ছিল না।
তবে গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুরো চিত্র পাল্টে যায়। ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে ছিটকে পড়ে ওসমান পরিবারের সদস্যরা। এরপর একে একে তারা দেশত্যাগ করেন বলে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। তাদের অনুপস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন থানায় হত্যা, গুম, হামলা ও দখলবাণিজ্যসহ নানা অভিযোগে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়।
ইতোমধ্যে এসব মামলার কয়েকটির তদন্ত শেষ হয়েছে এবং কিছু মামলায় বিচার কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। বিশেষ করে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এসব মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানসহ পরিবারের ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন ও সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় সন্ত্রাস আর পেশির জোরে প্রাচ্যের ড্যান্ডি খ্যাত নারায়ণগঞ্জে রাজত্ব করেছেন ওসমান পরিবার। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের পুরোটা সময় ওসমান পরিবারের দুই সন্তান অয়ন ওসমান ও আজমেরী ওসমান নিজেকে নারায়নগঞ্জের কিং বলে পরিচয় দিতেন।
যে ভাবে শুরু ১৯৯৬ সালে শামীম ওসমান এমপি হওয়ার পর থেকে নারায়ণগঞ্জে ওসমান পরিবারের ঐতিহ্য ও খ্যাতি এবং রাজনৈতিক আদর্শের পতন শুরু হয়। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত পুরো নারায়ণগঞ্জের রাজত্ব নিজের কব্জায় নিতে শামীম ওসমান গড়ে তোলে নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী। নারায়ণগঞ্জে শুরু হয় ওসমানী পরিবারের একচ্ছত্র শাসন ব্যবস্থা। ২০০০ সালের ১৬ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে নারায়ণগঞ্জে গোলাম আযম, দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী ও আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদকে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়। এরপরেই মূলত ওই এলাকার নামকরণ হয় সাইনবোর্ড। ওই সমাবেশের তিনদিন পর মুন্সিগঞ্জে একটি কর্মসূচি ছিল মতিউর রহমান নিজামীর। কিন্তু সেই অনুষ্ঠানে যেতে পারেননি নিজামী। জামায়েত ও জামায়েত ইসলামির আমির গোলাম আযমকে নিষিদ্ধ ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা, খালেদা জিয়ার লংমার্চের গাড়ি বহর আটকে দেওয়াসহ পুরো নারায়ণগঞ্জে হত্যা, সন্ত্রাসী কার্যক্রম, চাঁদাবাজি এবং লোটপাটের
কারণেই লোকমুখে শামীম ওসমান হয়ে ওঠেন নারায়ণগঞ্জের ‘গডফাদার’। ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের পর গডফাদারের রাজত্ব ছেড়ে শামীম ওসমান পালিয়ে যান। সংসদ নির্বাচন এগিয়ে এলে ২০০৬ সালের শেষদিকে পুনরায় তিনি দেশে আসেন। কিন্তু ২০০৭ সালে ‘ওয়ান ইলেভেনের’একদিন আগে তিনি আবার দেশ ছাড়েন। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকার গঠন করা হলে এপ্রিলে তিনি আবার দেশে ফেরেন। ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে নির্বাচন করে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর জনপ্রিয়তার কাছে হেরে যান। এরপর ২০১৪, ১৮ ও ২৪ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এমপি হয়ে পুরো নারায়নগঞ্জে ওসমানী রাজত্ব কায়েম করেন শামীম ওসমান। স্থানীয় নির্বাচনে নিজের পছন্দের প্রার্থীদের বিনা প্রতিদ্ব›দ্বীতায় নির্বাচিত করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেন তিনি। পছন্দের প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে দলীয় প্রার্থীর পরাজয় নিশ্চিত করতে তিনি পিছ পা হতেন না। নির্বাচনে প্রশাসনের কর্তব্যাক্তিরা তার প্রার্থীর পক্ষে কাজ না করলে প্রকাশ্যে হুমকি দিতেও দেখা গেছে শামীম ওসমানকে।
নারায়ণগঞ্জের অপরাধ জগতের মাফিয়া ভাতিজা আজমেরী :
শামীম ওসমানের ভাই জাতীয় পার্টির প্রয়াত সংসদ সদস্য নাসিম ওসমানের একমাত্র ছেলে আজমেরী ওসমান। পুরো নারায়ণগঞ্জের মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রন, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, খুন, ক্যাডার বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ, প্রকাশ্যে ২ থেকে ৩ শত ক্যাডার বাহিনীর হাতে বিদেশী অস্ত্রসহ শতাধিক গাড়ির মহড়াসহ এমন কোন অপরাধ নেই যার সাথে আজমেরি ওসমান জড়িত নেই। তার হামলা থেকে রেহাই পায়নি সময়ের নারায়ণগঞ্জ নামের পত্রিকা অফিসও।
শামীমের ভাতিজা আজমেরী ওসমানের বিরুদ্ধে কমপক্ষে ১৬ হত্যার অভিযোগ রয়েছে। তারপরও প্রকাশ্যে দাপিয়ে বেড়াতেন নারায়ণগঞ্জ। আলোচিত মেধাবী ছাত্র ত্বকী হত্যার ঘটনায় র্যাব তাঁর বিরুদ্ধে খসড়া অভিযোগপত্র দিয়েছিল। তবে রাষ্ট্রীয় শীর্ষ পর্যায় থেকে অলিখিত নিষেধাজ্ঞা থাকায় কখনও গ্রেপ্তার হননি আজমেরী।
এমনকি হত্যা মামলায় তাঁর নাম দিতে চাইলেও থানা পুলিশ তা নিতো না। নারায়নগঞ্জের সকল সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ও অপরাধের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকলেও বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি তাঁকে। বাবা-চাচাদের আস্কারায় খুনি আজমেরী ওসমান নারায়ণগঞ্জে অপরাধের স্বর্গ রাজত্ব গড়ে তুলেছিলেন। তিনি কাউকেই মানতেন না। যা চাইতেন তাই হতো। তার অপকর্মের বিরুদ্ধে স্থানীয় গনমাধ্যমকর্মীরা লিখলে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধামকি এমনকি হামলা শিকার হতে হয়েছে। শুধু ত্বকী হত্যা নয় আরও বিভিন্ন খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত ছিলেন আজমেরী ওসমান। ৫ আগস্টে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন।
অয়ন ওসমানের ছত্রছায়ায় নারায়ণগঞ্জে বেপরোয়া ছাত্রলীগ:
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে অয়ন ওসমানও আওয়ামী লীগের কোনো পদ পদবীতে না থেকেও রাজনীতির মাঠে অনেক প্রভাব ফেলতেন। বিশেষ করে জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগকে তিনি এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন। জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের পদে আসতে হলে তার অনুগত হতে হতো। তার আনুগত্যের বাইরে কেউ ছাত্রলীগের পদে আসতে পারতেন না। সেই সঙ্গে অয়ন ওসমানের অনুসারী ছাত্রলীগ নেতারা অনেক সময় মূল দলের নেতাদেরও অপমান অপদস্থ করতেন। তাদের কারণে ত্যাগী নেতারাও মূল্যায়ন পেতেন না। ছাত্র অবস্থায়ই অস্ত্রের ঝনঝনানি ছিল তাদের হাতে। সবশেষ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় শামীম ওসমানের অস্ত্রের মহড়ায় তারা অস্ত্র সরবরাহের দায়িত্বে ছিলেন। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বর্তমানে তাদের মধ্যে অনেকে দেশের বাইরে ও দেশেই আত্মগোপনে রয়েছেন।
আইনজীবীরা বলছেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে যেসব অভিযোগ আগে প্রকাশ্যে আসেনি, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেগুলো সামনে চলে আসছে। অন্যদিকে ওসমান পরিবারের সমর্থকরা দাবি করছেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকেই তাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে মামলা দেওয়া হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জের সচেতন মহলের মতে, এক সময় যারা পুরো জেলার রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতেন, আজ তাদের বিরুদ্ধেই আদালতে বিচার কার্যক্রম শুরু হওয়া জেলার রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় এক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে। বর্তমানে ওসমান পরিবারের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও চলছে নানা আলোচনা ও বিশ্লেষণ।

