নারায়ণগঞ্জে বিএনপির সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের সমন্বয় নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। জেলা আইনজীবী সমিতিতে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের প্রকাশ্য সংঘর্ষ, মহানগর বিএনপির দুই নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ এবং ছাত্রদল-যুবদলের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ সব মিলিয়ে দলটির অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও নেতৃত্বের কর্তৃত্ব নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে, নারায়ণগঞ্জ বিএনপিতে দলীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে চেইন অব কমান্ড কতটা কার্যকর রয়েছে?
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিরোধ এখন শুধু একটি কমিটি কিংবা একটি পদকে কেন্দ্র করে সীমাবদ্ধ নেই। আইনজীবী সংগঠনের নেতৃত্ব, আদালত অঙ্গনে সরকারি কৌঁসুলি নিয়োগ, দলীয় পদ-পদবি এবং অঙ্গসংগঠনগুলোর নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে অসন্তোষের চিত্র সামনে এসেছে।
গত ৬ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির ভবনে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় জেলা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকির ও অ্যাডভোকেট ওমর ফারুখ নয়ন ও আহত হন। ঘটনাস্থলে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানও উপস্থিত ছিলেন। ঘটনাটি দুই পক্ষের মধ্যে চলমান বিরোধকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে।
জেলা আইনজীবী সমিতির আসন্ন নির্বাচনে সভাপতি পদে প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে সাখাওয়াত হোসেন খান ও বর্তমান সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এইচ এম আনোয়ার প্রধানের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়। আনোয়ার প্রধান সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে। অন্যদিকে সাখাওয়াত হোসেন খান সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাকির হোসেনকে সমর্থন করছেন বলে একাধিক সূত্র থেকে শোনা যায়।
এ বিরোধের পেছনে আদালতে বিশেষ সরকারি কৌঁসুলি নিয়োগ এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনের সুযোগ নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। ফলে আইনজীবী সমিতির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ক্রমেই রাজনৈতিক প্রভাব ও নেতৃত্বের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ বিএনপির সাংগঠনিক সংকট নিয়ে আলোচনার আরেকটি দিক হলো অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা। ছাত্রদল ও যুবদল বিএনপির সাংগঠনিক বিস্তার, নতুন কর্মী তৈরি এবং মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কমিটি গঠন নিয়ে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা কিংবা নেতৃত্বের কর্তৃত্ব নিয়ে বিরোধ থাকলে কর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তবে সব ইউনিটের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে ।
নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের নতুন কমিটি না হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ রয়েছে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের একাংশের মধ্যে।
২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সিদ্ধান্তে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। একই সঙ্গে জেলা ও মহানগরের অধীন উপজেলা, থানা, পৌরসভা, কলেজ, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটিও বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।
এরপর দুই বছর পার হলেও জেলা ও মহানগরে নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলে অভিযোগ নেতাকর্মীদের। দীর্ঘদিন কমিটি না থাকায় সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে এবং নেতৃত্বপ্রত্যাশীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে বলে তাদের দাবি।
এর আগে ২০২৩ সালের ২৬ জানুয়ারি নাহিদ হাসান ভূঁইয়াকে সভাপতি ও জুবায়ের রহমান জিকুকে সাধারণ সম্পাদক করে নয় সদস্যের জেলা ছাত্রদলের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। একই দিন রাকিবুর রহমান সাগরকে সভাপতি ও রাহিদ ইসতিয়াক সিকদারকে সাধারণ সম্পাদক করে ছয় সদস্যের মহানগর ছাত্রদলের আংশিক কমিটি দেওয়া হয়। তবে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের আগেই ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দুই কমিটি বিলুপ্ত করা হয়।
ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের একাংশের অভিযোগ, নতুন কমিটি না থাকায় নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘদিন রাজপথে সক্রিয় থাকা নেতারা সাংগঠনিক পদ ও দায়িত্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের সংগঠনে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
ছাত্রদলের পাশাপাশি মহানগর যুবদলের অভ্যন্তরেও নেতৃত্ব ও ইউনিট কমিটি গঠন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ্যে এসেছে। দীর্ঘদিন ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি না হওয়া এবং ত্যাগী নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন না করার অভিযোগ রয়েছে সংগঠনটির একাংশের।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সহিদুল ইসলাম পৃথকভাবে দলীয় কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন। পরদিন ১ অক্টোবর চিটাগাংরোড এলাকায় অনুসারীদের নিয়ে পৃথক শোডাউন করেন তিনি। এর আগে মহানগর যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সাগর প্রধানও পৃথক কর্মসূচি পালন করে আলোচনায় আসেন।
২০২৩ সালের ২৯ আগস্ট মনিরুল ইসলাম সজলকে আহ্বায়ক, সাগর প্রধানকে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এবং সাহেদ আহমেদকে সদস্যসচিব করে মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। পরে ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হলেও ইউনিট পর্যায়ে সাংগঠনিক পুনর্গঠন সম্পন্ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও যুবদল নেতা অ্যাডভোকেট রাকিবুর রহমান সাগরকে ঘিরেও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মহানগর যুবদলের সম্ভাব্য নতুন কমিটিকে সামনে রেখে তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে তাঁর অনুসারীদের অভিযোগ।
নারায়ণগঞ্জ মহানগর জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সর্বশেষ আহ্বায়ক কমিটি গঠনের প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেলেও নতুন কমিটি গঠনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা পাওয়া যায়নি। ২০২৩ সালের ১৫ অক্টোবর ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। ওই কমিটিতে সাখাওয়াত ইসলাম রানাকে আহ্বায়ক, মমিনুর রহমান বাবুকে সদস্যসচিব এবং কামালউদ্দিন জনিকে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়।
এর আগে ২০২৩ সালের ২৯ আগস্ট তিন সদস্যের প্রাথমিক আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। পরে ১৫ অক্টোবর ৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটি প্রকাশ করা হয়। এর মধ্য দিয়ে মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নতুন নেতৃত্ব নির্ধারণ করা হয়।
নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে একটি বড় প্রশ্ন হলো দলীয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সাংগঠনিক কাঠামো কতটা কার্যকর, আর ব্যক্তিগত প্রভাব কতটা প্রাধান্য পাচ্ছে?
মূল দল ও অঙ্গসংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয় দুর্বল হলে মাঠপর্যায়ে কর্মসূচি বাস্তবায়ন, কর্মীদের সক্রিয় রাখা এবং সাধারণ মানুষের কাছে দলের ইতিবাচক ভাবমূর্তি বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে একই রাজনৈতিক বলয়ের নেতারা প্রকাশ্যে বিরোধে জড়ালে কর্মীদের মধ্যে বিভক্তি বাড়ার ঝুঁকি থাকে।

