নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের আলোচিত মুখ অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকারকে ঘিরে ফের শুরু হয়েছে রাজনৈতিক আলোচনা। বিএনপি থেকে বহিষ্কারের প্রায় চার বছর পর তার সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য ও প্রকাশ্য রাজনৈতিক উপস্থিতি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে পুরনো দলের সঙ্গে কি আবারও কোনো ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে?
তবে এখন পর্যন্ত বিএনপির পক্ষ থেকে তৈমূর আলম খন্দকারকে পুনর্বহাল কিংবা দলে ফেরানোর বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। ফলে বিষয়টি আপাতত রাজনৈতিক অঙ্গনের আলোচনা ও সম্ভাবনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
সম্প্রতি ১২ সেপ্টেম্বর মাসদাইর বাজারের মুসলিম একাডেমিতে অনুষ্ঠিত একটি দোয়া ও মিলাদ মাহফিলে বক্তব্য দেন তৈমূর। সেখানে নিজের জীবনের ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা চাওয়ার কথা বলেন তিনি। তার ওই বক্তব্যের পরই স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে নতুন করে শুরু হয় নানা আলোচনা।
অনুষ্ঠানে তৈমূর বলেন, মানুষের পৃথিবী থেকে বিদায়ের সময় কেউ জানে না। জীবনে কোনো ভুল হয়ে থাকলে তা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “কখন মারা যাই, কখন আল্লাহ দুনিয়া থেকে নিয়ে যায়—যদি কোনো ভুল করে থাকি ক্ষমা করে দিবেন। ভুল তো অবশ্যই আছে; আমি ক্ষমা চাই।”
তৈমূরের এই বক্তব্যে বিএনপিতে ফেরার বিষয়ে সরাসরি কোনো ঘোষণা না থাকলেও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরিচয় এবং বিএনপির সঙ্গে তার সম্পর্কের ইতিহাস সামনে এনে নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে।
তৈমূর আলম খন্দকারের সঙ্গে বিএনপির দূরত্বের সূত্রপাত মূলত ২০২২ সালের নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। বিএনপি ওই নির্বাচন বর্জন করলেও দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মেয়র নির্বাচনে অংশ নেন তিনি।
এর আগে ৩ জানুয়ারি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদ এবং নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়কের দায়িত্ব থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে দল থেকে বহিষ্কার করা হয় তাকে।
ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী ১ লাখ ৫৯ হাজার ৯৭ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। তৈমূর পান ৯২ হাজার ৫৬২ ভোট। ভোটের ব্যবধান ছিল ৬৬ হাজার ৫৩৫।
তবে নির্বাচনের পরও বিএনপির সঙ্গে নিজের আদর্শগত সম্পর্কের বিষয়টি বিভিন্ন সময় তুলে ধরেছেন তৈমূর। পরবর্তী সময়ে তৃণমূল বিএনপিতে যোগ দিয়ে দলের মহাসচিবের দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে তৃণমূল বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তৈমূর আলম খন্দকার। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী গোলাম দস্তগীর গাজী ১ লাখ ৫৬ হাজার ৪৮৩ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তৈমূর পান ৩ হাজার ১৯০ ভোট।
নির্বাচনী প্রচারের সময়ও বিএনপির সঙ্গে নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্কের কথা প্রকাশ্যে তুলে ধরেছিলেন তিনি। সে সময় তিনি জাতীয়তাবাদী আদর্শে নিজের অবস্থানের কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন, “আমার রক্ত, মাংস, পরিবার, চৌদ্দ গুষ্ঠি বিএনপি।”এই বক্তব্যকে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ হিসেবে দেখেন তার অনুসারীরা।
তৈমূরকে ঘিরে বর্তমান আলোচনার পেছনে নারায়ণগঞ্জ বিএনপিতে বহিষ্কৃত বা দূরে থাকা কয়েকজন নেতার পুনরায় দলে ফেরার ঘটনাও প্রভাব ফেলছে। স্থানীয় পর্যায়ে এটিএম কামাল, রিয়াদ চৌধুরী, মনিরুল ইসলাম সেন্টু, আতাউর রহমান মুকুল, শওকত হাশেম শকু, হান্নান সরকার, গোলাম নবী মুরাদ ও সুলতান আহমেদ ভূঁইয়াসহ কয়েকজন নেতার বিএনপিতে ফেরার বিষয়টি আলোচিত হয়েছে।
এ কারণে দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে আগের মতো তৈমূর আলম খন্দকারের ক্ষেত্রেও কি কোনো পর্যায়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে? তবে অন্য নেতাদের ক্ষেত্রে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা তৈমূরের ক্ষেত্রেও হবে এমন কোনো নিশ্চয়তা এখনো নেই।
তৈমূরের বিএনপিতে ফেরার আলোচনায় তার নিজের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চলতি বছরের শুরুতে বিএনপির দায়িত্বশীল কয়েকজন নেতার সঙ্গে তার অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ হয়েছে এবং তাকে লিখিত আবেদন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তবে তৈমূর নিজে আবেদন না করে দলের পক্ষ থেকে উদ্যোগের অপেক্ষায় রয়েছেন।
অন্যদিকে জানুয়ারিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিএনপি ও জনগণের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন তৈমূর। একই সময়ে তিনি দাবি করেন, তার বহিষ্কার নিয়ে খালেদা জিয়াও একসময় প্রশ্ন তুলেছিলেন। তার এসব বক্তব্যে বিএনপির সঙ্গে পুরনো সম্পর্কের বিষয়টি বারবার সামনে এসেছে।
তৈমূর আলম খন্দকার বিএনপিতে ফিরবেন কি না এ প্রশ্নের পাশাপাশি আরেকটি বিষয়ও স্থানীয় রাজনীতিতে আলোচনায় এসেছে। যদি কোনো পর্যায়ে তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয় বা তিনি দলে ফিরে আসেন, তাহলে বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামোয় তার অবস্থান কী হবে?
নারায়ণগঞ্জ বিএনপির নেতৃত্বে গত কয়েক বছরে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। নতুন নেতৃত্ব, নতুন সাংগঠনিক সমীকরণ এবং মাঠপর্যায়ে একাধিক বলয়ের উপস্থিতির মধ্যে তৈমূরের প্রত্যাবর্তন হলে তার রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়েও স্বাভাবিকভাবেই আলোচনা তৈরি হতে পারে।
তবে এটি এখনো সম্ভাবনাভিত্তিক আলোচনা। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো অবস্থান জানায়নি।
১২ সেপ্টেম্বরের অনুষ্ঠানে তৈমূরের ক্ষমা চাওয়ার বক্তব্যের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নিয়ে নানা আলোচনা হলেও বক্তব্যটিকে সরাসরি বিএনপিতে ফেরার আবেদন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ তিনি সেখানে বিএনপিতে যোগদান বা বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেননি।
তবু দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা, বিএনপির সঙ্গে তার পুরনো সম্পর্ক, ২০২২ সালের সিটি নির্বাচন, পরবর্তী সময়ে তৃণমূল বিএনপিতে যোগদান এবং সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য সব মিলিয়ে তৈমূরকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
এখন দেখার বিষয়, এই আলোচনা কেবল স্থানীয় রাজনৈতিক জল্পনাতেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি ভবিষ্যতে বিএনপির পক্ষ থেকে তৈমূর আলম খন্দকারকে নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ সামনে আসে।

