নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে শওকত হাসেম শকু একটি পরিচিত নাম। দীর্ঘদিন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং মহানগর বিএনপির বিভিন্ন পদে থাকার পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ক্ষমতাসীন বলয়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ ও নানা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনায় ছিলেন তিনি।
আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়জুড়ে নারায়ণগঞ্জে ওসমান পরিবারের প্রভাব ছিল রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়। সেই সময়ে বিএনপির রাজনীতিতে থেকেও শওকত হাসেম শকুর সঙ্গে ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল প্রকাশ্য । আবার আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিএনপির রাজনীতিতেও তাঁকে সক্রিয় দেখা যায়। ফলে রাজনৈতিক মহলে তাঁকে ঘিরে ‘দুই আমলেই সুবিধা নেওয়ার’ আলোচনা তৈরি হয়েছে।
শওকত হাসেম শকু দীর্ঘদিন নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি মহানগর বিএনপির যুগ্ম সম্পাদকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বে ছিলেন। একই সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
২০২২ সালের নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ১২ নম্বর ওয়ার্ড থেকে তিনি কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। নির্বাচনের ফলাফলে তাঁকে বিএনপি-ঘনিষ্ঠ কাউন্সিলর হিসেবে ধরা হয়।অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁর অবস্থান ছিল শক্তিশালী। বিএনপি দলীয় রাজনীতির পরিচয় বজায় রেখেও তিনি জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
শওকত হাসেম শকুকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয় আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য এ কে এম সেলিম ওসমানের সঙ্গে তাঁর প্রকাশ্য রাজনৈতিক যোগাযোগকে কেন্দ্র করে।
২০১৬ সালে শওকত হাসেম শকুর আয়োজিত একটি মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান। ওই সময় শকু ছিলেন নগর বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ও ১২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। সেলিম ওসমানের বক্তব্যেও শকুর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের বিষয়টি উঠে আসে।
আরও বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতাদের সঙ্গে একই রাজনৈতিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে শওকত হাসেম শকু উপস্থিত থাকেন। ২০২৩ সালের একটি অনুষ্ঠানে সেলিম ওসমান ও আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে একই মঞ্চে শকুর উপস্থিতি তাকে বিতকৃত করে তোলে। এসব ঘটনা থেকেই বিএনপির ভেতরে ও বাইরে প্রশ্ন ওঠে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিএনপির একজন নেতার সঙ্গে ক্ষমতাসীন বলয়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের এমন ঘনিষ্ঠতা কেন ছিল?
শওকত হাসেম শকুর রাজনৈতিক অবস্থানকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে এখানেই। একদিকে তিনি বিএনপির মহানগর পর্যায়ের নেতা ও বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর হিসেবে পরিচিত ছিলেন, অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ওসমান পরিবারের সঙ্গে তাঁর প্রকাশ্য যোগাযোগ দেখা গেছে।
২০২৩ সালের শেষ দিকে শওকত হাসেম শকুর রাজনৈতিক জীবনে বড় ধাক্কা আসে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী সেলিম ওসমানের নির্বাচনী প্রচারে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর বিএনপি শওকত হাসেম শকুসহ নারায়ণগঞ্জের ছয় নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করে। তাঁদের প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলের সব পর্যায়ের পদ কেড়ে নেওয়া হয়।
অর্থাৎ যে ব্যক্তিকে দীর্ঘদিন বিএনপির স্থানীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হয়েছিল, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগে তাঁকেই দল থেকে বহিষ্কৃত হতে হয়।
র্দীঘ দিন দলের বাহিরে থাকার পর শওকত হাসেম শকুর রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে ২০২৫ সালের নভেম্বরে। ১৯ নভেম্বর বিএনপি তাঁর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নেয়। দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও দলের নীতি-আদর্শ পরিপন্থী কার্যকলাপের কারণে আগে বহিষ্কার করা হলেও আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁর প্রাথমিক সদস্যপদ ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ ২০২৩ সালে সেলিম ওসমানের নির্বাচনী প্রচারে সম্পৃক্ততার অভিযোগে বহিষ্কার হওয়ার পর প্রায় দুই বছরের ব্যবধানে তিনি আবার বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ ফিরে পান।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেলে শওকত হাসেম শকুকেও বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে আবার সক্রিয় দেখা যায়।
২০২৬ সালের বিভিন্ন বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাঁর উপস্থিতি সবার নজরে পড়ে । এতে দেখা যায়, ২০২৩ সালে দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও পরবর্তীতে তিনি বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন।
শওকত হাসেম শকুকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে মূল প্রশ্নটি এখন এটাই তিনি কি আদর্শিক রাজনীতির চেয়ে পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা একজন রাজনৈতিক চরিত্র?
তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের দিকে তাকালে দেখা যায়, দীর্ঘ সময় বিএনপির রাজনীতিতে থেকেও আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ক্ষমতাসীন বলয়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর প্রকাশ্য যোগাযোগ ছিল। ২০১৬ সালে সেলিম ওসমানের সঙ্গে তাঁর প্রকাশ্য রাজনৈতিক অনুষ্ঠান, ২০২৩ সালে সেলিম ওসমানের নির্বাচনী প্রচারে সম্পৃক্ততার অভিযোগ এবং সে কারণে বিএনপির বহিষ্কার এসব তথ্য তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
আবার বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পরও তিনি দলটির রাজনৈতিক কর্মসূচির বাইরে পুরোপুরি চলে যাননি। ২০২৫ সালে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার এবং পরবর্তীতে বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ দেখিয়েছে যে দলটির সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সম্পর্ক পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তাই সমালোচকদের ভাষায় তিনি ‘ক্ষমতার সঙ্গে সমঝোতা করে চলা’ রাজনীতিক হলেও, তাঁর সমর্থকদের দাবি হতে পারে তিনি স্থানীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগ বজায় রেখেছেন।
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে শওকত হাসেম শকুর দীর্ঘ পথচলা মূলত এক ধরনের রাজনৈতিক বৈপরীত্যের গল্প। বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় নেতা ও কাউন্সিলর হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জাতীয় পার্টির প্রভাবশালী সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের সঙ্গে তাঁর প্রকাশ্য যোগাযোগ ছিল। পরে সেলিম ওসমানের নির্বাচনী প্রচারে সম্পৃক্ততার অভিযোগে বিএনপি তাঁকে বহিষ্কার করে। আবার সময়ের ব্যবধানে সেই বিএনপিই তাঁর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে সদস্যপদ ফিরিয়ে দেয়।
ফলে শওকত হাসেম শকুকে নিয়ে ‘দুই আমলেই সুবিধা নেওয়া’—এমন রাজনৈতিক অভিযোগের ভিত্তি হিসেবে তাঁর অতীতের ঘটনাগুলো সামনে আনা যায়। তবে তিনি ব্যক্তিগতভাবে কী সুবিধা নিয়েছেন, কার কাছ থেকে কী সুবিধা পেয়েছেন কিংবা কোনো আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেছেন এমন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া এসব অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।
বরং তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ঘটনাপ্রবাহ বলছে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক যোগাযোগের ধরন বদলেছে, আবার হারানো দলীয় অবস্থানও তিনি পুনরুদ্ধার করতে পেরেছেন। আর এই কারণেই নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে শওকত হাসেম শকুকে ঘিরে ‘সুবিধাভোগী রাজনীতি’র আলোচনা এখনও থামেনি।
দুই আমলেই আলোচনায় শকু: ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কের রাজনীতি
Leave a Comment

