ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি সম্প্রতি ভারতে এক বিরল সফরের সময় পাকিস্তানকে সতর্ক করে বলেন, ‘আফগানদের সাহস পরীক্ষা করা উচিত হবে না। সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র বা ন্যাটোকে জিজ্ঞাসা করুন- আফগানিস্তানের সঙ্গে খেলা ভালো কিছু নিয়ে আসে না।’ তার এই হুঁশিয়ারি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পুরোনো সেই বিতর্ককে আবারও জাগিয়ে তোলে: আফগানিস্তান কি সত্যিই ‘গ্রেভইয়ার্ড অব এম্পায়ার্স’ বা সাম্রাজ্যের সমাধিস্থল/পতনস্থল?
বিখ্যাত এই বর্ণনার পেছনে দুটি বড় উদাহরণ সবচেয়ে বেশি আলোচিতÑ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পরাজয় এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন। ১৮৩৯ সালে প্রথম অ্যাংলো-আফগান যুদ্ধের সময় কাবুল থেকে ব্রিটিশ-ভারতীয় বাহিনীর প্রায় পুরো বহর ধ্বংস হয়ে যায়। পরবর্তী ৮০ বছরে দুইবার চেষ্টা করেও ব্রিটিশরা আফগানিস্তানকে নিয়ন্ত্রণে নিতে ব্যর্থ হয়।
এরপর আসে সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯৭৯ সালে মস্কো আফগানিস্তানে আক্রমণ চালায়, কিন্তু মুজাহিদিনদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত বাহিনী দেশটি ছাড়তে বাধ্য হয়; যা সোভিয়েত পতনের অন্যতম পূর্বাভাস হিসেবে ইতিহাসে রয়ে গেছে।
২০০১ সালে ৯/১১ হামলার পর আফগানিস্তানে ঢুকে পড়ে মার্কিন বাহিনী। দুই মাসের মধ্যে তালেবান সরকারের পতন হলেও ২০ বছরের দীর্ঘ যুদ্ধে ওয়াশিংটন কাক্সিক্ষত স্থিতিশীলতা বা কার্যকর রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। ২০২১ সালে মার্কিন বাহিনী হঠাৎ সরিয়ে নিলে তালেবান আবারো ক্ষমতায় আসে।
কেন সবাই ব্যর্থ হয়- বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আফগানিস্তানে ব্যর্থতার পেছনে কয়েকটি সাধারণ কারণ রয়েছে। পাহাড়-উপত্যকায় ঘেরা দেশের ভৌগোলিক পরিস্থিতি এবং জটিল ভূপ্রকৃতি আক্রমণকারীদের জন্য বড় বাধা। স্থানীয় পরিবেশ ও ভূখ- সম্পর্কে অজ্ঞতা বারবার বিদেশি পরাশক্তিকে বিপদে ফেলেছে।
এশিয়ার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এ দেশের সমাজ ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও উপজাতির নিজস্ব নিয়ম-কানুন রয়েছে। বাইরের শক্তির জন্য এই সমাজকে বুঝতে পারা এবং নিয়ন্ত্রণ করা দুঃসাধ্য।
ব্রিটিশরা ভুল কূটনীতি ও গোয়েন্দা ব্যর্থতায় হোঁচট খায়। সোভিয়েতরা তাদের কড়া মতাদর্শ নিয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। আর যুক্তরাষ্ট্র ব্যর্থ হয় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর রাষ্ট্র গঠন কৌশলের অভাবে।
চলতি বছরের ৯ অক্টোবর কাবুলে সিরিজ বিস্ফোরণের পর তালেবান অভিযোগ করে যে পাকিস্তান বিমান হামলা চালিয়েছে, যদিও ইসলামাবাদ তা নিশ্চিত করেনি। দুদিন পর পাকিস্তানি পোস্টে গুলি চালায় আফগান সেনারা। পাকিস্তানও পাল্টা হামলা চালায়। পরে তুরস্ক ও কাতারের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হয়।
কিন্তু মূল সমস্যা থেকে যায়। আফগানিস্তান এখনো আল-কায়েদা, আইএস, টিটিপি ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল। পাকিস্তান ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বারবার অনুরোধ করলেও তালেবান এসব গোষ্ঠী দমনে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উপাধির পেছনে বাস্তবতা যেমন আছে, তেমনি রয়েছে জাতীয়তাবাদী রোমান্টিসিজম ও অতি জাতীয়তাবাদ। দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ‘আফগানিস্তানে বিদেশি শক্তির সফলতার ইতিহাস খুবই কম। কিন্তু সব ব্যর্থতার কারণ ভূখ- নয়-নীতিগত ভুল এবং প্রস্তুতির অভাবও বড় কারণ।’
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ম্যাগনাস মার্সডেন বলেন, ‘দেশের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি ও সামাজিক জটিলতা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে ক্লান্ত করে তোলে।’ আফগান সাংবাদিক সামি ইউসুফজাই বলেন, ‘এসব অর্জন ও বর্ণনা আফগান জাতির ‘অদম্য প্রতিরোধশক্তি’ তুলে ধরে এবং জাতীয় গর্ব বাড়ায়।’
সত্যিকারের ছবি কী- ‘সাম্রাজ্যের কবরস্থান’ তখনই হয় আফগানিস্তান যখন কোনো পরাশক্তি দেশটিকে না জেনে, না বুঝে, ভুল কৌশলে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। কিন্তু পাকিস্তানের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা। ইসলামাবাদ দেশটিকে জয় করতে চায় না; বরং স্থিতিশীলতা চায়। কারণ দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্য এশিয়ার শান্তির চাবিকাঠি আফগানিস্তানের মধ্যেই রয়েছে।
২০২০ সালে পাকিস্তানের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল জাবেদ বাজওয়া বলেছিলেন,‘আঞ্চলিক শান্তির পথ আফগানিস্তানের মধ্যে দিয়ে গেছে।’ আজও তার কথার গুরুত্ব কমেনি। সুতরাং, আফগানিস্তান এক অর্থে ‘কবরস্থান’ কিন্তু সাম্রাজ্যের নয়, ভুল কৌশল, ভুল সিদ্ধান্ত ও ভুল বোঝার কবরস্থান।
‘সাম্রাজ্যের সমাধিস্থল’
Leave a Comment

