ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ গ্যাসের নিম্নচাপে রূপগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। টানা কয়েকদিন ধরে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকায় শিল্প-কারখানাগুলোর উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে বিকল্প জ্বালানিতে উৎপাদন চালানোর চেষ্টা করছে, আবার কোথাও শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনাও ঘটছে। একই সঙ্গে গ্যাস সংকটে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ফিলিং স্টেশনগুলো। আবাসিক গ্রাহকদেরও চড়া দামে গ্যাস সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে।
রূপগঞ্জ উপজেলার যাত্রামুড়া, বরাব, বরপা, ভূলতা, আড়িয়াবো, কর্ণগোপ, গোলাকান্দাইল, মুড়াপাড়া, কাঞ্চন, হাটাবো, সাওঘাট, কাতরারচক, ডহরগাঁও, পাড়াগাঁও, বানিয়াদি এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে প্রায় দুই হাজার ছোট-বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রয়েছে হারবেস্ট রিচ গার্মেন্টস, অলটেক্স, অন্তিম নিটিং ডাইং অ্যান্ড ফিনিশিং, গ্রামটেক নিট ডাইং অ্যান্ড ফিনিশিং, ফকির ফ্যাশন, সিটি অয়েল মিল, রবিন টেক্স অ্যান্ড গার্মেন্টস লিমিটেডসহ বিভিন্ন কারখানা। এসব প্রতিষ্ঠানে প্যান্ট, শার্ট, গেঞ্জি, থ্রিপিস, চাদর, প্রিন্ট কাপড়, লুঙ্গি ও প্লাস্টিকজাত পণ্য উৎপাদিত হয়। অনেক কারখানাই গ্যাসচালিত জেনারেটরের মাধ্যমে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন করে থাকে।
কারখানা মালিকদের দাবি, কয়েকদিন ধরে গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে, মেশিন পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে গিয়ে উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে। তবুও কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। ফলে লোকসানের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে।
একটি ডাইং কারখানার প্রশাসনিক কর্মকর্তা কামাল হোসেন বলেন, গ্যাস না থাকলে তাদের পুরো লাইন বন্ধ হয়ে যায়। ডিজেল দিয়ে চালালে খরচ বেড়ে যায় কয়েকগুণ। এভাবে দীর্ঘদিন চললে টিকে থাকা কঠিন হবে।
আম্বার বোর্ড মিলস লিমিটেড কারখানায় গ্যাস সংকটের প্রভাব প্রকট। কারখানার এক কর্মকর্তা জানান, স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক প্রায় পাঁচ হাজার পিস বোর্ড উৎপাদন হলেও বর্তমানে তা দুই থেকে আড়াই হাজারে নেমে এসেছে। মেশিন পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো না গেলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায় এবং অর্ডার সরবরাহে বিলম্ব হয়।
গ্যাসের নিম্নচাপ ও অনিয়মিত সরবরাহের কারণে একাধিক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। ফলে কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়েছে।
ভূলতা এলাকার রবিনটেক্স বাংলাদেশ লিমিটেড নামে কারখানায় গ্যাসের নিম্নচাপের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সম্প্রতি ৬৫ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। শ্রমিকদের অভিযোগ, উৎপাদন স্বাভাবিক না থাকায় তারা নিয়মিত কাজ পাচ্ছেন না এবং আয়ের অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।
ফতুল্লা সংলগ্ন শিল্প এলাকার ইউরোটেক্স নিটওয়্যার লিমিটেড কারখানায় গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন কাজে ব্যাঘাত ঘটছে। প্রতিষ্ঠানটির ২৭ জন শ্রমিক চাকরি হারাতে বাধ্য হয়েছেন। শ্রমিকরা বলছেন, উৎপাদন কমে যাওয়ায় তাদের আয় কমছে এবং ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
গ্যাসের চাপ কম থাকায় ফিলিং স্টেশনগুলোতেও সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাস না পেয়ে অনেক চালক বিকল্প হিসেবে তরল জ্বালানি ব্যবহার করছেন। সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক আব্দুল মালেক বলেন, গ্যাস না পেলে তেল দিয়ে গাড়ি চালাতে হয়, এতে প্রতিদিন লোকসান হচ্ছে।
আবাসিক এলাকাতেও গ্যাসের সংকট। রান্নার জন্য অনেকে বাধ্য হয়ে বেশি দামে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার কিনছেন। গৃহিণী রেহানা বেগম জানান, লাইনে গ্যাস না থাকায় সিলিন্ডার গ্যাস কিনতে হচ্ছে। এতে সংসারের খরচ বেড়ে গেছে।
রবিনটেক্স বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামের ভাষ্য, বর্তমান গ্যাস-সংক্রান্ত পরিস্থিতি বস্ত্র শিল্পের জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের চাপ নিম্ন থাকায় উৎপাদন রুটিনে রাখতে পারছেন না, ফলে কেবল কিছু ইউনিটই কাজ চালাতে সক্ষম। তিনি বলেন, ‘শ্রমিকদের কার্যক্রম কম হওয়ায় আমরা দুঃখিত; তবে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে এবং ক্ষতি প্রতিরোধে শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে– এটা কোনো দোষারোপ নয়; বরং পরিস্থিতির বাস্তব চাহিদা। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এই ধারা চলতে পারে।’
ইউরোটেক্সের পরিচালক (অপারেশন) এ কে এম সাইদুল হক জানান, গ্যাস সংকটের ফলে উৎপাদন কমে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি পূর্ণ কর্মক্ষমতায় নেই। যার কারণে কিছু পদে সাময়িক কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়েছেন। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে পুনরায় কর্মী সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে।
ফেয়ার অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল্লাহ মাহমুদ বলেন, তাদের ডাইং ইউনিট সাধারণত দিনে ৩০ টন কাপড় রং করতে সক্ষম। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে দিনে মাত্র সাত টন পর্যন্তই উৎপাদন হচ্ছে।
লিটল স্টার স্পিনিং মিলের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ খোরশেদ আলমের ভাষ্য, রূপগঞ্জে গ্যাসের চাপ গত তিন সপ্তাহ ধরে খুব কম। তাদের কারখানায় বর্তমানে গ্যাস না থাকায় উৎপাদন সক্ষমতা ৪০-৫০ শতাংশে নেমে এসেছে। প্রতি পাউন্ড সুতা উৎপাদনে প্রায় ২৭ টাকা লোকসান করছেন তারা।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের রূপগঞ্জ আঞ্চলিক বিপণন বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জানান, বিভিন্ন স্থানে গ্যাস লাইনে ছিদ্র দেখা দেওয়ায় মেরামত চলছে। এই কারণে ডিআরএস থেকে সাময়িকভাবে গ্যাসের চাপ কমানো হয়েছে। দ্রুতই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।

