ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ শরীফ ওসমান হাদির খুনিদের গ্রেপ্তারে সরকারকে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছে ইনকিলাব মঞ্চ। তা না হলে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. কর্নেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদা বকশ চৌধুরীর পদত্যাগ দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। শনিবার হাদিকে কবরে শায়িত করার পর সংগঠনটির সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের এ ঘোষণা দেন।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদিকে দাফনের পর ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে শাহবাগ চত্বর। শিক্ষার্থী ছাত্র-জনতা শাহবাগে জড়ো হন। এরপর নানা স্লোগানে প্রকম্পিত করে তোলেন শাহবাগ চত্বর। এ সময় ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের সরকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, এই মুহূর্তে সরকার পতন আন্দোলনের ঘোষণা দিলে আপনারা টিকবেন না। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তার না করলে জনগণকে আমরা আর থামিয়ে রাখবো না। জানাজার নামাজের সময় সরকারের পক্ষ থেকে বিচার নিয়ে কোনো কথা হয়নি। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হাদিকে যারা খুন করেছে, এ খুনের পরিকল্পনা ও সহযোগিতা করেছে তাদের প্রত্যেককে অতি দ্রুত গ্রেপ্তার করতে না পারলে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে যথাযথ জবাব দিতে হবে। এক সপ্তাহে তারা কতোটুকু এগিয়ে যেতে পেরেছেন তা জনতার সামনে এসে বলতে হবে। তা না হলে শিক্ষার্থী-জনতাকে নিয়ে কঠোর পদক্ষেপ ঘোষণা করবো। টকশোতে যারা খুনিদের পক্ষে কথা বলবে তাদের সঙ্গে আমরা নেই।
জাবের বলেন, হাদির জানাজার পরে পুরো প্রশাসন এমন ব্যবস্থা করেছে যেন ইনকিলাব মঞ্চের কর্মীদের মেরে ফেলা যায়। ওসমান হাদির লাশবহনকারী গাড়ির পাশে রহস্যজনক লোকেরা দৌড়ে গেছে, আমরা তাদের চিনি না। প্রশাসন আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে খেলছে।
তিনি বলেন, আজ পর্যন্ত কোনো নেতা এমন দলমত নির্বিশেষে মানুষের ভালোবাসা পায়নি। আমরা ওসমান হাদির রক্তের বদলা নিতে এসেছি। এই বাংলাদেশ কীভাবে চলবে, তা এখানকার জনগণ ঠিক করবে। ওসমান হাদিকে একজন খুন করেনি, এর পেছনে একটি চক্র রয়েছে। বিগত ১৫ বছরে আমরা দেখেছি গোয়েন্দা সংস্থা কেউ মাটির ১৫ ফিট গভীরে লুকিয়ে থাকলেও তাকে গ্রেপ্তার করেছে, কিন্তু এখন তারা গাছাড়া ভাব নিয়ে বসে আছে। এ সময় তিনি সেনাবাহিনীর ইন্টিলিজিন্সের মধ্যে আওয়ামী কর্মকর্তা রয়েছে বলে অভিযোগ করে বলেন, এসব কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিতে হবে। না হলে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা পাবে না। তিনি প্রকৃত আসামিকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়ে বলেন, যদি ওই সন্ত্রাসী দিল্লিতে পালিয়ে থাকে, তাহলে তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে হবে। দিল্লি থেকে যদি অপরাধীকে ফিরিয়ে আনতে নাই পারে তাহলে বন্দি বিনিময় চুক্তি করে লাভ কি?
তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচন বাধাগ্রস্তের ষড়যন্ত্র রয়েছে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ষড়যন্ত্র হচ্ছে। তারা চাইছে ওসমান হাদি যে লড়াইটা শুরু করেছিলেন, সেটা যেন কোনোভাবেই ফোকাসে না থাকে। এ জন্য দেখবেন বিভিন্ন লোক বিভিন্ন জায়গায় স্যাবোটাজ করা শুরু করে দিয়েছে। আমরা কি তাদের সেই সুযোগ দেবো? আমাদের প্রথম দাবি হচ্ছে খুনিদের গ্রেপ্তার করা। এরপর সব আলাপ। আলাপ শুরুই হবে খুনিকে গ্রেপ্তারের মধ্যদিয়ে। এর আগে কোনো আলাপ চলবে না।’
দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সবাইকে শান্ত থাকতে হবে উল্লেখ করে জাবের বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে আর দিল্লির কাছে বর্গা দেয়া চলবে না। আমরা দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতায় বিশ্বাস করি। কেউ যাতে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারে, সে জন্য সবাইকে ইনকিলাব মঞ্চের একেকজন কর্মী হয়ে যেতে হবে।’
এর আগে বিকাল ৩টা ২০ মিনিটের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধি চত্বরে ওসমান হাদিকে দাফন করা হয়। জানাজার পর লাখো মানুষের ঢল নামে শাহবাগ এলাকায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যারিকেড পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে না পারলেও শাহবাগ চত্বরেই অবস্থান নেন তারা।
ওসমান হাদিকে দাফন করার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন তার বন্ধু, রাজনৈতিক সহযোদ্ধাসহ সকলে। দাফনের মুহূর্তে পুরো এলাকা নীরব হয়ে যায়। মোনাজাত শুরু হতেই অনেকে আর চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। কেউ দু’হাত তুলে কান্নায় ভেঙে পড়েন, কেউ নিচুস্বরে কোরআনের আয়াত পড়তে থাকেন। হাদির পরিবার ও স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। সহযোদ্ধারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে চোখ মুছতে থাকেন।
দাফনের পর উপস্থিত সবাইকে নিয়ে বিকাল ৪টার দিকে মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। মোনাজাতে অংশগ্রহণ করেন কবরস্থান গেটের বাইরে অবস্থানরত স্বেচ্ছাসেবী, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। শরীফ ওসমান হাদির বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিক মোনাজাত পরিচালনা করেন। এ সময় তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আল্লাহ আমার ভাইয়ের শাহাদত কবুল করুন’।
এ সময় আবু বকর সিদ্দিক আরও বলেন, আল্লাহ যেন শরীফ ওসমান হাদিকে শহীদ হিসেবে মর্যাদা দেন এবং তার সমস্ত গুনাহ মাফ করেন। তিনি বিশেষভাবে প্রার্থনা করেন, হাদির পরিবারকে এই শোক সইবার শক্তি দিন এবং যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, তাদের জন্যও আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। এ ছাড়া, হাদির রেখে যাওয়া ইনকিলাব মঞ্চ এবং তার কর্মকাণ্ড যাতে আগামী দিনগুলোতে আরও শক্তিশালী হয়, সে জন্যও মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন।

