নারায়ণগঞ্জ নগরীতে ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করার অভিযান ঘিরে আবারও মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) প্রশাসন ও হকাররা। উচ্ছেদ অভিযান চালাতে গিয়ে বিক্ষুব্ধ হকারদের ঘেরাওয়ের মুখে পড়েছেন সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। এ সময় বিক্ষোভ, বাগ্বিতণ্ডা ও ধস্তাধস্তির ঘটনায় নগরজুড়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিনের হকার সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় পরিস্থিতি বড় ধরনের সংঘর্ষের দিকে গড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রোববার (২৫ অক্টোবর) রাত সাড়ে ৯টার দিকে নগরীর পুরাতন কোর্ট, কালীবাজার মোড়সংলগ্ন শায়েস্তা খাঁ সড়কে এ ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ সময় প্রশাসককে ঘিরে রেখে হকারদের বিক্ষোভের কারণে সড়কে যান চলাচলও ব্যাহত হয় ।ঘটনার পর হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে বারবার অভিযান চালিয়েও কেন ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা যাচ্ছে না? একদিকে নগরীর যানজট নিরসন ও পথচারীদের চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করার দাবি, অন্যদিকে জীবিকা হারানোর আশঙ্কায় হকারদের প্রতিবাদ এই দুইয়ের সংঘাত কি শেষ পর্যন্ত রাজপথে বড় ধরনের সহিংসতার জন্ম দেবে?
রোববার রাতে নাসিক প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খানের নেতৃত্বে সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদকর্মীরা অভিযান পরিচালনা করেন। এ সময় সড়ক ও ফুটপাতে থাকা অস্থায়ী দোকান, ভ্যান ও পণ্য সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। অভিযানে মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপুও উপস্থিত ছিলেন।
হকারদের অভিযোগ, আগাম নোটিশ বা যথাযথভাবে সতর্ক না করেই রাতে অভিযান চালানো হয়। এ সময় তাঁদের দোকানের চৌকি ও ভ্যান ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে এবং বিক্রির জন্য রাখা পণ্য সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অন্তত ১০টি সবজিবাহী ভ্যান সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
অন্যদিকে, প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খানের দাবি, সড়ক ও ফুটপাত দখল করে মালামাল রাখার কারণে জনসাধারণের চলাচলে বিঘ্ন ঘটছিল। উচ্ছেদকর্মীরা দায়িত্ব পালন করতে গেলে হকাররা বাধা দেন এবং পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা করেন।
একপর্যায়ে হকাররা প্রশাসককে ঘিরে বিক্ষোভ শুরু করেন। সিটি করপোরেশনের কর্মীদের সঙ্গে তাঁদের ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে। পরে সদর মডেল থানা পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। উভয় পক্ষের বক্তব্যে ঘটনার দায় নিয়ে পরস্পরবিরোধী অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নারায়ণগঞ্জে হকার উচ্ছেদ নতুন কোনো ঘটনা নয়। নগরীর বঙ্গবন্ধু সড়ক, শায়েস্তা খাঁ সড়ক, কালীবাজার, চাষাঢ়া ও আশপাশের এলাকায় ফুটপাত দখলমুক্ত করতে বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালানো হয়েছে। কিন্তু অভিযানের পর কিছুদিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও অনেক জায়গায় আবারও দোকানপাট বসতে দেখা যায়নি।
চলতি বছরের ২৯ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জে হকার পুনর্বাসনের দাবিতে বিক্ষোভ ও সমাবেশের পর জেলা প্রশাসন ও সিটি করপোরেশন যৌথভাবে উচ্ছেদ অভিযান চালায়। নবাব সিরাজউদ্দৌলা সড়ক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী সড়ক, কালীবাজার মোড় ও নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুলের সামনের এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। অর্থাৎ পুনর্বাসনের দাবি ও উচ্ছেদ কার্যক্রমের দ্বন্দ্ব কয়েক মাস ধরেই চলছিল।
এর কয়েক দিন পর, ৩ মে হকাররা আবারও বিক্ষোভ করেন। তাঁদের দাবি ছিল, বিকেল ৫টা থেকে ব্যবসা করার সুযোগ দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। জাতীয়তাবাদী হকার্স ইউনিয়নের মহানগর শাখার সভাপতি কেএম মিজানুর রহমান রনি সে সময় প্রশাসনকে ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা দিয়ে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন। এসব ঘটনা থেকে স্পষ্ট, হকার উচ্ছেদ নিয়ে বিরোধ কেবল তাৎক্ষণিক কোনো অভিযানকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়নি। বরং ব্যবসার সময় নির্ধারণ, বিকল্প স্থান, পুনর্বাসন এবং উচ্ছেদের পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘদিনের মতবিরোধ এর পেছনে কাজ করছে।
নারায়ণগঞ্জে হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে বড় সংঘর্ষের স্মৃতি এখনো নগরবাসীর মনে রয়েছে। ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে তৎকালীন মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ও সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের সমর্থকদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছিল। ওই ঘটনায় মেয়র আইভীসহ সাংবাদিক ও অন্যরা আহত হন।
সেই ঘটনার পরও হকার সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ, বিক্ষোভ, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং পুনর্বাসনের দাবি সামনে এসেছে। এবারের ঘটনাও নতুন করে পুরোনো সেই সংঘাতের স্মৃতি সামনে নিয়ে এসেছে।
এ ছাড়া চলতি বছরের ১৭ এপ্রিল সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল মোড়ে হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে অন্তত পাঁচজন আহত হন। এ ঘটনায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের একটি লেন প্রায় আধা ঘণ্টা অবরুদ্ধ ছিল। অর্থাৎ হকার উচ্ছেদ নিয়ে বিরোধ এখন শুধু নগরীর ফুটপাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বিভিন্ন এলাকায় তা সংঘর্ষ ও জনদুর্ভোগের কারণ হয়ে উঠেছে।
নগরীর প্রধান সড়ক ও ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় পথচারীদের বাধ্য হয়ে সড়ক দিয়ে চলাচল করতে হয়। এতে যানজট বাড়ে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয় এবং জরুরি প্রয়োজনে মানুষের চলাচলও ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকায় দোকানের সামনে পণ্য রাখা, ভ্যান দাঁড় করিয়ে মালামাল ওঠানো-নামানো এবং ফুটপাতজুড়ে অস্থায়ী দোকান বসানো জনদুর্ভোগ বাড়ায়।
অন্যদিকে, হকারদের একটি বড় অংশের জীবিকা সরাসরি এই ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। তাঁদের বক্তব্য, বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া উচ্ছেদ করা হলে পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়তে হয়। দিনের পর দিন ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করা এসব মানুষের কাছে দোকান সরিয়ে নেওয়া মানে শুধু একটি জায়গা হারানো নয়, বরং আয়-রোজগারের অনিশ্চয়তাও।
এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে না পারায় প্রশাসন ও হকারদের মধ্যে বিরোধ বারবার ফিরে আসছে। উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে সংঘাত তৈরি হলে ক্ষতিগ্রস্ত হন শুধু হকার বা প্রশাসনের কর্মীরা নন, ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ নগরবাসীও।
সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে হকারদের জন্য বিকল্প জায়গা নির্ধারণ করে দেওয়ার কথা উঠে এসেছে। তবে হকারদের একটি অংশ সেখানে না গিয়ে মূল সড়ক ও ফুটপাতেই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। এর পেছনে বিকল্প স্থানের অবস্থান, ক্রেতা পাওয়া, ব্যবসার পরিবেশ এবং আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কার মতো বিষয় কতটা ভূমিকা রাখছে, তা নিয়ে বিস্তারিত মূল্যায়ন প্রয়োজন।
শুধু উচ্ছেদ চালিয়ে সাময়িকভাবে ফুটপাত খালি করা সম্ভব হলেও নিয়মিত নজরদারি, নির্দিষ্ট ব্যবসার সময়, কার্যকর পুনর্বাসন এবং আইন প্রয়োগে ধারাবাহিকতা ছাড়া স্থায়ী সমাধান কঠিন। একই সঙ্গে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে, যাতে কোনো গোষ্ঠী বিশেষ সুবিধা পায় এমন অভিযোগ তৈরি না হয়।
রোববার রাতের ঘটনার পর হকার ও সিটি করপোরেশনের মধ্যে উত্তেজনা নিরসনে আলোচনার উদ্যোগের কথা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছে। সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকাল ১০টায় সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কার্যালয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বৈঠক হওয়ার কথা ছিল।
নগরীর ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা যেমন সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব, তেমনি হকারদের জীবিকার বিষয়টিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, বাস্তবসম্মত পুনর্বাসন, ব্যবসার সময় ও স্থান নির্ধারণ এবং নিয়ম ভঙ্গ করলে সবার ক্ষেত্রে সমান ব্যবস্থা।
নারায়ণগঞ্জের মানুষ চান চলাচলযোগ্য ফুটপাত, যানজটমুক্ত সড়ক ও নিরাপদ নগরজীবন। আর হকাররা চান জীবিকা নির্বাহের নিশ্চয়তা। এই দুই চাহিদার মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে না পারলে উচ্ছেদ অভিযান, বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের চক্র চলতেই থাকবে। গত রাতের ঘটনা সেই পুরোনো সমস্যারই নতুন সতর্কসংকেত। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন এবারও কেবল উচ্ছেদেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি স্থায়ী সমাধানের পথে এগোয়।

