নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক হিসাব-নিকাশ সামনে আসছে। একদিকে জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবীদের সাংগঠনিক তৎপরতা ও অবস্থান নিয়ে আলোচনা, অন্যদিকে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের মধ্যে বিভক্তি এবং সাম্প্রতিক সংঘর্ষের ঘটনা নির্বাচনী পরিবেশকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বিশেষ করে গত ৬ অক্টোবর আইনজীবী সমিতিতে দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনার পর বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ভোটের মাঠে কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
তবে জামায়াতপন্থী আইনজীবীদের সাংগঠনিক শক্তি কতটা, বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধের প্রভাব কতদূর বিস্তৃত এবং সাধারণ আইনজীবীদের ভোট কোন দিকে যেতে পারে এসব বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নির্ভরযোগ্য নির্বাচনী তথ্য এখনো প্রয়োজন।
নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির আসন্ন নির্বাচন ঘিরে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ এখন আলোচনার কেন্দ্রে। নির্বাচনে সভাপতি পদে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে মতপার্থক্য, পৃথক বলয় তৈরি এবং দুই পক্ষের মধ্যে প্রকাশ্য হাতাহাতির ঘটনায় বিএনপির আইনজীবী রাজনীতিতে বিভক্তির চিত্র সামনে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত আইনজীবীরা নিজেদের সাংগঠনিক অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
গত ৬ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতি ভবনে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এতে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকিরসহ কয়েকজন আহত হন। ঘটনাটি আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বিরোধের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।
আইনজীবী মহলে আলোচনায় রয়েছে, বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের একটি অংশের সঙ্গে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের ঘনিষ্ঠদের বিরোধ তীব্র হয়েছে। অন্যদিকে আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও সদর থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এইচ এম আনোয়ার প্রধানকে ঘিরেও পৃথক বলয় তৈরি হয়েছে ।
এই বিরোধের পেছনে নির্বাচনে নেতৃত্ব ও প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে মতপার্থক্যের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। ফলে নির্বাচনে বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রার্থী দিতে পারবেন কি না, নাকি একাধিক প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামবে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির গত নির্বাচনে জামায়াত-সমর্থিত আইনজীবীদের সংগঠন বাংলাদেশ ল’ইয়ার্স কাউন্সিলের প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। ২০২৫ সালের ২৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপিপন্থী প্যানেল ১৭টি পদের মধ্যে ১৬টিতে জয়ী হয়। জামায়াত-সমর্থিত প্যানেল থেকে একটি সদস্য পদে প্রার্থী নির্বাচিত হন।
গত নির্বাচনের ফলাফল জামায়াতপন্থী আইনজীবীদের বর্তমান সাংগঠনিক শক্তির পূর্ণ চিত্র নয়। তবে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ দীর্ঘায়িত হলে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমীকরণে তার প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের মধ্যে সমঝোতা না হলে ভোট ভাগাভাগির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে জামায়াতপন্থী আইনজীবীরা ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারলে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধরনও আলোচনায় আসবে।
আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, পেশাগত সম্পর্ক, প্রার্থীদের কর্মকাণ্ড এবং সাধারণ আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে বিএনপির দুই পক্ষের বিরোধ ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে কি না, তা নির্ভর করবে নির্বাচনের আগে সমঝোতা, প্রার্থী চূড়ান্তকরণ এবং প্রচার-প্রচারণার ওপর।
এ ছাড়া ৬ অক্টোবরের সংঘর্ষের পর দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় নেওয়া পদক্ষেপ এবং বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগও নির্বাচনী পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিরোধের কারণে কোনো পক্ষের সমর্থকেরা অসন্তুষ্ট হলে তার প্রতিফলন ভোটে পড়তে পারে; আবার শেষ মুহূর্তে সমঝোতা হলে পরিস্থিতি ভিন্নও হতে পারে।
সব মিলিয়ে, নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির আসন্ন নির্বাচন শুধু প্যানেলগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সীমাবদ্ধ থাকছে না; বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের ঐক্য, জামায়াতপন্থীদের সাংগঠনিক তৎপরতা এবং সাধারণ আইনজীবীদের আস্থার প্রশ্নও সামনে আসছে। তবে জামায়াতের অবস্থান কতটা শক্তিশালী হয়েছে কিংবা বিএনপির বিভক্তি শেষ পর্যন্ত ভোটের ফলাফলে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ধারণের জন্য প্রার্থী তালিকা, সমর্থনের বাস্তব চিত্র ও নির্বাচনী পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

