একসময় নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে জাতীয় পার্টির ছিল দৃশ্যমান দাপট। লাঙল প্রতীকের প্রার্থী মানেই ছিল নির্বাচনী সমীকরণের গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম। নাসিম ওসমান, সেলিম ওসমান, লিয়াকত হোসেন খোকা কিংবা পারভীন ওসমান ।ওসমান পরিবারের একাধিক সদস্যের সক্রিয় রাজনীতিকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জে জাতীয় পার্টির আলাদা একটি রাজনৈতিক বলয় তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সময় বদলেছে। বদলেছে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক সমীকরণও।
একসময় যে দলটি জেলার দুটি সংসদীয় আসনে সংসদ সদস্য দিয়ে রাজনীতি করেছে, সেই জাতীয় পার্টিই এখন সংসদীয় প্রতিনিধিত্বহীন। মাঠের কর্মসূচিতে আগের সেই সরব উপস্থিতিও চোখে পড়ছে না। জেলা ও মহানগরে কমিটি থাকলেও নিয়মিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তৃণমূল নেতাকর্মীদের দৃশ্যমান উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ফলে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন নারায়ণগঞ্জে কি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে জাতীয় পার্টি?
নারায়ণগঞ্জে জাতীয় পার্টির শক্ত অবস্থান তৈরির পেছনে সবচেয়ে আলোচিত নাম নাসিম ওসমান। ১৯৫৩ সালের ৩১ জুলাই জন্ম নেওয়া নাসিম ওসমান ১৯৮৬, ১৯৮৮, ২০০৮ ও ২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তাঁর মৃত্যুর পর নারায়ণগঞ্জের জাতীয় পার্টিতে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। বিশেষ করে ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে তাঁর জয় নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে জাতীয় পার্টির দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক ও নির্বাচনী প্রভাবকে সামনে নিয়ে আসে।
২০১৪ সালের ২৯ এপ্রিল নাসিম ওসমানের মৃত্যুর পর আসনটি শূন্য হলে উপনির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হন তাঁর ছোট ভাই এ কে এম সেলিম ওসমান। লাঙল প্রতীকে তিনি ৮২ হাজার ৮৫৬ ভোট পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম আকরামকে ১৮ হাজার ৭৪২ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। সেখান থেকেই শুরু হয় নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে সেলিম ওসমানের অধ্যায়।
নাসিম ওসমানের মৃত্যুর পর তাঁর রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে উঠে আসেন সেলিম ওসমান। ২০১৪ সালের উপনির্বাচনের পর ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনেও তিনি লাঙল প্রতীকে নির্বাচিত হন। ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন থেকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে জয় পান তিনি। নির্বাচনী তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সেলিম ওসমান ১ লাখ ৫২ হাজার ২৯২ ভোট পেয়েছিলেন। অর্থাৎ ২০১৪ থেকে ২০২৪ এক দশক ধরে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে জাতীয় পার্টির প্রধান মুখ ছিলেন সেলিম ওসমান। কিন্তু ২০২৬ সালের নির্বাচনে এসে সেই ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ে। নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে জাতীয় পার্টির কোনো প্রার্থী না থাকায় দলটির দীর্ঘদিনের সংসদীয় উপস্থিতিও শেষ হয়ে যায়।
শুধু নারায়ণগঞ্জ-৫ নয়, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনেও জাতীয় পার্টির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক উপস্থিতি ছিল।
সোনারগাঁ-কেন্দ্রিক রাজনীতিতে লিয়াকত হোসেন খোকা ছিলেন জাতীয় পার্টির অন্যতম পরিচিত মুখ। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ-৩ ও নারায়ণগঞ্জ-৫—দুটি আসনেই জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ছিল। ফলে জেলার রাজনৈতিক সমীকরণে লাঙল ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি শক্তি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই অবস্থানও ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।
২০২৪ সালের নির্বাচনে লিয়াকত হোসেন খোকা নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে জাতীয় পার্টির দলীয় প্রার্থী না হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থী কায়সার হাসনাতের কাছে পরাজিত হন। এখানেই জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক দুর্বলতার আরেকটি দিক সামনে আসে দলের পরিচিত মুখদের মধ্যেও দলীয় প্রতীকের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছিল।
নাসিম ওসমানের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী পারভীন ওসমানের রাজনৈতিক সক্রিয়তাও নারায়ণগঞ্জের জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে আলোচনায় আসে। নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে জাতীয় পার্টির মনোনয়নকে কেন্দ্র করে একসময় সেলিম ওসমান ও পারভীন ওসমানের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। পারভীন ওসমান দলীয় মনোনয়ন চেয়ে সভা-সমাবেশও করেছিলেন। পরে সেলিম ওসমান দলীয় মনোনয়ন পেলে তাঁর পক্ষে পারভীন ওসমানকে মাঠে দেখা যায়নি। সে সময় পারভীন ওসমান নিজেই বলেছিলেন, দলের পক্ষ থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি এবং কোনো নির্দেশনাও দেওয়া হয়নি। এই ঘটনা নারায়ণগঞ্জ জাতীয় পার্টির ভেতরের নেতৃত্বের টানাপোড়েনকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে।
পরবর্তীতে ২০২২ সালে অনুমোদিত নারায়ণগঞ্জ জেলা জাতীয় পার্টির কমিটিতে সদস্য হিসেবে পারভীন ওসমানের নাম রাখা হয়। একই কমিটিতে সেলিম ওসমান ও লিয়াকত হোসেন খোকার নামও ছিল। কাগজে কমিটি থাকলেও মাঠে কার কতটা সক্রিয়তা রয়েছে সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক দুর্বলতার প্রশ্ন উঠলেও নারায়ণগঞ্জে দলটির কমিটি যে ছোট নয়, তার প্রমাণ রয়েছে।
২০২২ সালের ১৭ জুন বন্দরের সমরক্ষেত্র মাঠে জেলা জাতীয় পার্টির সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। পরে সানাউল্লাহ সানুকে সভাপতি এবং আবু নাঈম ইকবালকে সাধারণ সম্পাদক করে ২৫১ সদস্যের জেলা কমিটি অনুমোদন করা হয়। ওই কমিটিতে সেলিম ওসমান, লিয়াকত হোসেন খোকা ও পারভীন ওসমানসহ অনেক পরিচিত নেতার নাম সদস্য হিসেবে রাখা হয়।
একই সময়ে মোদাচ্ছেরুল হক দুলালকে সভাপতি এবং আফজাল হোসেনকে সাধারণ সম্পাদক করে ১৭২ সদস্যের মহানগর কমিটি ঘোষণা করা হয়। মহানগর কমিটির সদস্য তালিকাতেও সেলিম ওসমান, লিয়াকত হোসেন খোকা ও পারভীন ওসমানের নাম ছিল। অর্থাৎ কাগজে-কলমে নারায়ণগঞ্জ জাতীয় পার্টির সংগঠন ছিল বিশাল। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই বিশাল সংগঠনের কতজন এখন মাঠে সক্রিয়?
নারায়ণগঞ্জের জাতীয় পার্টির বর্তমান সংকটের জায়গাটি এখানেই।
একসময় দলীয় কর্মসূচিতে জেলা ও মহানগরের নেতাকর্মীদের বড় মিছিল দেখা যেত। নাসিম ওসমানের কর্মসূচি, সেলিম ওসমানের নির্বাচনী প্রচারণা কিংবা লিয়াকত হোসেন খোকার সোনারগাঁয়ের রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘিরে নেতাকর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল। এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে।
জেলা ও মহানগর কমিটি রয়েছে, থানা-উপজেলা পর্যায়েও কমিটি রয়েছে। কিন্তু নিয়মিত রাজনৈতিক কর্মসূচি, রাজপথে বড় মিছিল কিংবা তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক তৎপরতায় আগের সেই দৃশ্যমানতা নেই এমন অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যেই। ফলে দলের কমিটি কতটা সক্রিয় আর কতটা কাগজে সীমাবদ্ধ তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্র রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অবস্থানেও বড় পরিবর্তন আসে। এই পরিবর্তনের প্রভাব জাতীয় পার্টির ওপরও পড়ে।
কারণ নারায়ণগঞ্জে জাতীয় পার্টির দীর্ঘদিনের নির্বাচনী সাফল্যের পেছনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা ও বৃহত্তর নির্বাচনী জোটের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনগুলোর রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয় পার্টি নারায়ণগঞ্জের কিছু আসনে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের নির্বাচনে সেই সমীকরণ আর কার্যকর ছিল না। ফলাফল নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনের কোনোটিতেই জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য নেই।
নাসিম ওসমানের মৃত্যুর পর তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধরে রাখার চেষ্টা হয়েছে। সেলিম ওসমান নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন ধরে রেখেছিলেন এক দশক। লিয়াকত হোসেন খোকাও সোনারগাঁয়ে জাতীয় পার্টির শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিলেন। কিন্তু ব্যক্তিনির্ভর নেতৃত্বের বাইরে দলের নিজস্ব সাংগঠনিক ভিত্তি কতটা শক্ত ছিলবর্তমান পরিস্থিতি সেই প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে।
নাসিম ছিলেন এক ধরনের আবেগ ও সাংগঠনিক শক্তির কেন্দ্র। সেলিম ওসমান ছিলেন ব্যবসায়ী ও জনপ্রতিনিধি হিসেবে নিজস্ব প্রভাবের অধিকারী। লিয়াকত হোসেন খোকাও সোনারগাঁয়ে দীর্ঘ সময় ধরে নিজস্ব রাজনৈতিক বলয় ধরে রেখেছিলেন। কিন্তু এই নেতাদের বাইরে জাতীয় পার্টির দ্বিতীয় সারির নেতৃত্ব কতটা শক্তিশালী বর্তমান সংকট সেই প্রশ্নের উত্তরও খুঁজছে।
জাতীয় পার্টির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের একটি অংশের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হয়নি। অন্যদিকে পুরোনো অনেক নেতাকর্মী রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। কেউ কেউ অন্য রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে চলে গেছেন, আবার কেউ রাজনীতি থেকে দূরে সরে গেছেন। তবে এসব দাবির পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান প্রকাশ্যে নেই। ফলে দলের কতজন সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে আছেন বা কতজন নিষ্ক্রিয় তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তবে নির্বাচনী ফলাফল এবং মাঠের কর্মসূচির দৃশ্যমানতা আগের সঙ্গে তুলনা করলে পরিবর্তন স্পষ্ট।
নারায়ণগঞ্জের জাতীয় পার্টির বর্তমান অবস্থার সবচেয়ে বড় প্রতিফলন ২০২৬ সালের নির্বাচন। একসময় নারায়ণগঞ্জ-৫ ছিল জাতীয় পার্টির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনী ফলাফলে সেই ধারাবাহিকতা দেখা যায়। কিন্তু ২০২৬ সালে সেই আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থীই ছিল না।
নারায়ণগঞ্জ-৩-তেও একই চিত্র। যে আসনে লিয়াকত হোসেন খোকা দুই মেয়াদ সংসদ সদস্য ছিলেন, সেখানেও জাতীয় পার্টির আগের অবস্থান আর নেই। আর নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে জাতীয় পার্টি প্রার্থী দিলেও জয় পায়নি। ফলে জেলার পাঁচটি আসনের কোথাও জাতীয় পার্টির সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব নেই।
নারায়ণগঞ্জে জাতীয় পার্টির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সংগঠন পুনর্গঠন। নাসিম ওসমানের মতো দীর্ঘদিনের নেতার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, সেলিম ওসমানের দীর্ঘ সংসদীয় উপস্থিতি, লিয়াকত হোসেন খোকার সোনারগাঁয়ের রাজনৈতিক বলয় এবং পারভীন ওসমানের মতো পরিচিত মুখ সব মিলিয়ে দলটির একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু সেই ইতিহাসকে বর্তমান প্রজন্মের রাজনীতিতে কতটা কাজে লাগানো যাবে, সেটিই এখন প্রশ্ন।
জেলা ও মহানগরে কমিটি আছে। রয়েছে শত শত পদধারী নেতা। রয়েছে দীর্ঘদিনের কর্মী-সমর্থকও। কিন্তু রাজনীতিতে শুধু কমিটি থাকলেই সংগঠন সক্রিয় থাকে না। প্রয়োজন নিয়মিত কর্মসূচি, নতুন নেতৃত্ব, তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ভোটারদের মধ্যে নতুন করে রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি। নারায়ণগঞ্জে জাতীয় পার্টির সামনে তাই এখন প্রশ্ন একটাই লাঙল কি আবার রাজপথে ফিরবে, নাকি নাসিম ওসমান-সেলিম ওসমান-লিয়াকত হোসেন খোকাদের সময়ের রাজনৈতিক প্রভাব শুধু স্মৃতিতেই থেকে যাবে? সময়ের সঙ্গে সেই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে নারায়ণগঞ্জে জাতীয় পার্টির ভবিষ্যৎ।

