নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে রাজপথের কর্মসূচিতে দৃশ্যমানভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলো। বিপরীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের অধিকাংশ নেতাকর্মী প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নেই। দলটির অনেক নেতা আত্মগোপনে গ্রেপ্তার আতংকে ঘর বাড়ি ছাড়া অনেক নেতাকর্মী।
সম্প্রতি আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বর নাগাদ দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদেরও দেশে ফেরার কথা বলেন। একই সময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাঁর মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার বিষয়টি দেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এই রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে নারায়ণগঞ্জের রাজপথেও। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আওয়ামী লীগের কর্মসূচির প্রতিবাদ, নৈরাজ্য ও সহিংসতার আশঙ্কার বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে মিছিল-সমাবেশ করছে বিএনপি। মহানগর বিএনপি, থানা ও ওয়ার্ড বিএনপির পাশাপাশি যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, শ্রমিক দল, কৃষক দল, মহিলা দল, তাঁতীদল, হকার্স দলসহ বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের এসব কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে।
২৩ সেপ্টেম্বর নগরীর ডিআইটি এলাকা থেকে মহানগর বিএনপির উদ্যোগে আওয়ামী লীগের নৈরাজ্যের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান, সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু, যুগ্ম আহ্বায়কসহ যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। মিছিলটি নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সামনে গিয়ে শেষ হয়।
এর আগে ১২ সেপ্টেম্বর রাতেও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিলের প্রতিবাদে মহানগর বিএনপি বিক্ষোভ মিছিল করে। ১৮ সেপ্টেম্বর তারেক জিয়া পরিষদও নগরীতে প্রতিবাদ মিছিল করে। ১৯ সেপ্টেম্বর নাশকতা প্রতিরোধ ও সতর্কতামূলক কর্মসূচির অংশ হিসেবে সিদ্ধিরগঞ্জসহ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মিছিল ও মোটরসাইকেল শোডাউন করতে দেখা যায়।
এ ছাড়া ২১ সেপ্টেম্বর আড়াইহাজারে উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল করে। ২৫ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ সদর থানা বিএনপির বিক্ষোভ কর্মসূচিতেও বিভিন্ন ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন বিএনপির নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে যোগ দেন। গোগনগর ও আলীরটেক ইউনিয়ন বিএনপির পৃথক মিছিলের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্রকাশ্য তৎপরতার চিত্র তুলনামূলকভাবে সীমিত। ১৪ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ শহরে যুবলীগের ব্যানারে একটি ঝটিকা মিছিলের খবর প্রকাশিত হয়; পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ দেখে মিছিলকারীদের শনাক্তের চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছিল। ২৪ সেপ্টেম্বর ফতুল্লার মাসদাইর এলাকায় আওয়ামী লীগের মিছিলের প্রস্তুতির অভিযোগে ১৬ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্যও পাওয়া গেছে।
নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের জেলা ও মহানগর পর্যায়ের অনেক পরিচিত নেতা বর্তমানে প্রকাশ্য রাজনীতিতে নেই। কেউ আত্মগোপনে, কেউ কারাগারে এবং কেউ এলাকা ছেড়ে রয়েছেন ।রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাদের উপস্থিতি আগের তুলনায় অনেক কম এবং বিচ্ছিন্ন কিছু ঝটিকা করছে বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে।
এদিকে বিএনপির নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগ বা এর অঙ্গসংগঠনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের নাশকতা, সহিংসতা কিংবা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা হলে রাজপথে থেকেই তার রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা হবে। ২৩ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচিতে মহানগর বিএনপির নেতারা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে নেতাকর্মীদের সক্রিয় থাকার আহ্বান জানান।
ফলে নারায়ণগঞ্জের বর্তমান রাজনৈতিক মাঠে একদিকে বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর ধারাবাহিক মিছিল-সমাবেশ ও সাংগঠনিক উপস্থিতি, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্রকাশ্য রাজনৈতিক কার্যক্রমের সীমিত উপস্থিতি এই দুই বিপরীত চিত্রই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সামনে ডিসেম্বরকে ঘিরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলে নারায়ণগঞ্জের রাজপথেও তার প্রভাব পড়তে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। তবে সেটি এখনো সম্ভাবনার বিষয়, নিশ্চিত কোনো রাজনৈতিক ফলাফল নয়।

